পিয়ালী :
শারদ প্রাতে শিউলি বিছানো পথে মা আসছেন। চারিদিকে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জির। কাশের দোলাকে ভয় পাইয়ে দিয়ে প্রকৃতি মাঝে মাঝে রুদ্ররূপা হলেও ভুবন মাতাতে আলোর বেণু বেজে উঠেছে।

মাতৃ আরাধনা বা মাতৃ শক্তি পূজার এক রূপ হল দুর্গা পুজো। ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলতেন To look upon God as mother is the purest and the highest form of Sadhana.
আর তারই প্রিয় শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ (Swamiji) বেলুড় মঠে ১৯০১ সালে প্রতিমায় দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন।

আজকে আমাদের লেখার বিষয়বস্তু ভারতবর্ষের দুই মহামানব যুগপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ এবং নেতাজী (Netaji) সুভাষচন্দ্র বসুর দুর্গাপূজা তথা মাতৃ শক্তি আরাধনা।
বেলুড় মঠের ইতিহাস বলে, দুর্গাপূজা করার কিছুদিন আগে স্বামীজি মাকে দর্শন পান অর্থাৎ বেলুড় মঠে পুজো করার স্বপ্নাদেশ পান তিনি।
পাশাপাশি একথাও লিপিবদ্ধ আছে যে স্বামী ব্রহ্মানন্দ মা দুর্গাকে দক্ষিণেশ্বর থেকে ঘাট পেরিয়ে বেলুড় মঠের দিকে আসতে দেখেন।
এর আগে বরানগর মঠের রামকৃষ্ণদেবের শিষ্যদের উদ্যোগে দুর্গা পূজা হলেও মূর্তিতে পুজো করা বিবেকানন্দই বেলুড়মঠে প্রথম করেন।

ব্রহ্মানন্দ এবং বিবেকানন্দ দুজনেই দুর্গাপুজোর মাত্র কয়েকদিন আগে মাকে পুজো করার আদেশ পান। পুজো তো হবে। কিন্তু মূর্তি পাওয়া যাবে কোথা থেকে? চলল খোঁজ খোঁজ। শোভাবাজারে গঙ্গা পাড়ে কুমারটুলিতে গেলেন সন্ন্যাসীরা। অদ্ভুতভাবে পাওয়া গেল একটি নিখুঁত সুন্দর ছোট্ট প্রতিমা। অন্য কেউ অর্ডার দিয়ে গেছিলেন কিন্তু কোন কারনে নিয়ে যাননি। আনন্দিত মঠের সন্ন্যাসীরা সেই প্রতিমা নিয়ে এলেন বেলুরমঠে।
পুজো শুরু করার আগে স্বামী বিবেকানন্দ শ্রী শ্রী মা সারদা দেবীর কাছে পুজোর অনুমতি নেন। মাও তাতে আনন্দের সঙ্গে সম্মতি দেন। শুরু হলো বেলুড় মঠে দুর্গাপুজো। কিন্তু মঠের সন্ন্যাসীদের নামে তো সংকল্প হবে না। তাই মা সারদা দেবীর নামেই সংকল্প করা হয় বেলুড় মঠের মাতৃ মূর্তির। এইভাবেই বিবেকানন্দ মৃন্ময়ী মাকে চিন্ময়ী রূপে আরাধনা করেন।

সারদা মায়ের উপস্থিতিতে বেলুড় মঠের দুর্গা পুজোয় চার দিনে বহু মানুষের সমাগম হয়। বিবেকানন্দ সিস্টার নিবেদিতা কে চিঠিতে এই বিষয়ে উল্লেখ করেন। যদিও ভগিনী নিবেদিতার জ্বর – অসুখ থাকার জন্য তিনি আসতে পারেননি।
বিবেকানন্দ শুধুমাত্র মাটির প্রতিমাকে জাগিয়ে তোলার কাজ করেননি। তিনি যথার্থ অর্থেই অর্থাৎ আক্ষরিকভাবেই নারী শক্তিকে পুজো করার নারী শক্তি জাগরণের চেষ্টা করেছিলেন। তাইতো মঠের প্রথমবারের পুজোয় তিনি একনয় একাধিক কুমারী কন্যাকে পুজো করেন । সেই ঐতিহ্য আজও চলে আসছে এখন অবশ্য একজন কুমারীকে অষ্টমীতে বেলুড় মঠে পুজো করা হয়। বেলুড় মঠের কুমারী পুজোর খ্যাতি সারা বিশ্বজোড়া।

ইতিহাস বলে বিবেকানন্দ বেলুড় মঠের দুর্গা পুজোয় সন্ধিপূজার সময় অষ্টমী নবমীর সন্ধিক্ষণে পশুবলি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মা সারদা আপত্তি তোলেন। তার নিষেধ মেনে কোন পশু বলি না দিয়ে , কুমড়ো ও কলা বলি দেওয়া হয়। সেই ইতিহাস সেই পরম্পরা সেই ঐতিহ্য আজও চলে আসছে। তবে নবমীতে সাদা চাল কুমড়ো ও আখ বলি দেওয়া হয় মায়ের সামনে।
বিবেকানন্দ শ্রী শ্রী সারদা মায়ের নিষেধ শুনে পশু বলি থেকে বিরত থেকেছিলেন কারণ জগন্মাতা তো পশু পাখিদেরও মা তাই তিনি জীব হত্যা থেকে বিবেকানন্দকে বিরত করেন।
মাতৃ পূজা, শক্তির আরাধনা ,নারী শক্তির জাগরণ, মহিলাদের সম্মান প্রদর্শন বিবেকানন্দের এই পূজার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু পাশাপাশি ধর্ম বর্ণ সম্প্রদায় ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য দুর্গাপুজোয় বেলুড় মঠকে তিনি অবারিত দ্বার করেন।
এ তো গেলো সংক্ষেপে স্বামী বিবেকানন্দের দুর্গা পুজোর প্রচলন এবং ঐতিহ্যের কথা।
এবার আসা যাক নেতাজির শারদ – প্রতিমা পুজোর ইতিহাস বিষয়ে।

নেতাজির কাছে দুর্গাপুজো যেমন ছিল ভক্তি ও আরাধনা তেমনি তার পাশাপাশি পুজোকে কেন্দ্র করে বাঙালির পুনর্মিলন স্বদেশী ভাবনা এবং সর্বোপরি আত্মশক্তি জাগরণ।
তাইতো দক্ষিণ ২৪ পরগনার কোদালিয়া যা বর্তমানে সুভাষগ্রাম নামে পরিচিত সেখানকার বসু পরিবারের দুর্গা দালানে হওয়া মাতৃ আরাধনায় নেতাজি অংশ নিতেন।
বিশেষ করে অষ্টমীর দিন ঠাকুরদালানে মাতৃমূর্তির সামনে তিনি দীর্ঘক্ষণ সময় কাটাতেন।

বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসবের সঙ্গে নেতাজির নাম ওতপ্রতভাবে জড়িত।। বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গাপুজোর সভাপতি হিসেবে নেতাজি ছিলেন ১৯৩৮ সাল এবং তার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৩৯ সালেও।
সেখানে তিনি বীরাষ্টমীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।এছাড়া স্বদেশী মেলা অর্থাৎ স্বদেশী দ্রব্যের কেনাবেচা ও হত সেখানে। এইভাবে দেশীয় অর্থনীতির বিকাশওদূর্গা পূজার মাধ্যমে করতে চেয়েছিলেন নেতাজি।
উত্তর কলকাতার সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজোর সঙ্গেও নেতাজি যুক্ত ছিলেন ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি সেখানে যুক্ত হন। যদিও পরবর্তীতে অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকরা সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজো বন্ধ করে দেয়।
তবে আপনারা শুনলে শিহরিত হবেন যে জেলে বসে ও নেতাজি দুর্গা পুজো করেন এবং মৃন্ময়ী মাকে চিন্ময়ী রূপে জাগরিত করেন।
১৯২৪ সালের শেষে নেতাজিকে ব্রিটিশ সরকার গ্রেফতার করে মায়ানমারের মান্দালয় জেলে পাঠায়। কিন্তু জেলে বসেও নেতাজি ও তার অনুগামীরা দুর্গা পুজোর আয়োজন করেন। তারা ব্রিটিশ সরকারকে বাধ্য করেন কারাগারের অন্ধকারের মধ্যেই আলোকময়ী মায়ের আরাধনায় সাহায্য করতে এমনকি প্রতিমা পর্যন্ত সেখানে বানানো শুরু হয়। ব্রিটিশ সরকারকে চাপ দিয়ে পুরোহিত আনার বন্দোবস্ত করা হয়। এইভাবে নিষ্ঠাও ভক্তি সহকারে জেলের মধ্যেই দুর্গা পুজো করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

কথিত আছে সে বছর অর্থাৎ ১৯২৫ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর ছিল দুর্গাষ্টমী। সেখানে সুভাষ জেলে বসে মন্ত্র উচ্চারণ করেন। পরবর্তীকালে পরিবারকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেন এই পূজার মাধ্যমে তিনি আত্মশক্তির জাগরণ ঘটান।
১৯৩৯ সালে তিনি পুনরায় শিমলা ব্যায়াম সমিতির সভাপতি হন।
তবে নেতাজির জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বা সময় বলা যায় ১৯৪০ সাল। এই বছর ব্রিটিশ সরকার তাকে প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দী করে।
এর ফলে বাগবাজার বা সিমলা পূজা কমিটির সঙ্গে তার যোগাযোগ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু অদম্য নেতাজি প্রেসিডেন্সির জেল কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেন দুর্গাপুজো আয়োজন করতে দিতে ।তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্রেও এর প্রমাণ মেলে।
এই ছিল দুই মহামানবের দুর্গা পুজো আয়োজনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
দুজনেই মাতৃ শক্তির বন্দনা করেছেন কিন্তু চেষ্টা করেছেন দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে সামাজিক উত্তরণের।

Be the first to comment