অসমের ৫ যুবককে খুন করে কর্তব্যরত ৭ সেনা, অভিযুক্ত ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিলো আর্মি কোর্ট

Spread the love
৯৪-এর অসম। আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টের দাবরানি তখন  তুঙ্গে। সেই অতিরিক্ত ক্ষমতার প্রয়োগ করেই অসমের ৫ নিরীহ যুবককে অকথ্য অত্যাচারের পর খুন করে কর্তব্যরত ৭ সেনা। ১ মেজর ও ২ কর্ণেলের নেতৃত্বে সেই হত্যালীলা চলে খুব নিশ্চিন্তে। ঘটনার ২৪ বছর পর অভিযুক্ত সেই ৭ সেনাকে মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত করল আর্মি কোর্ট। ১৩ অক্টোবর ১ মেজর, ২ কর্ণেল সহ ৭ সেনার মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ জারি হয়। ২৪ বছরের টানা লড়াইয়ের পর অবেশেষে সুবিচার।
প্রবীর দত্ত,প্রবীণ সোনওয়াল, দেবজিৎ বিশ্বাস, অখিল সোনওয়াল,ভাবেন মোরন- এই ৫ যুবককে (ulfa) জঙ্গি সন্দেহে তুলে নিয়ে যায় ৭ সেনা। অসমের তিনসুকিয়ায় তখন বিত্তশালীদের টার্গেট করছে জঙ্গিরা। চলছে খুনের পর খুন।১৯৯৪-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি তালাপ চা বাগানের মালিককে গুলি করে খুন করে জঙ্গিরা। মৃত ব্যক্তি মোট ১৭টি চা বাগানের মালিক ছিলেন। ওই চত্ত্বরেই জমত মৃত ৫ যুবক সহ মোট ৮ জনের আড্ডা। তল্লাশির সময় ওই ৮ যুবককেই তুলে নিয়ে যায় সেনা। সেই ৮ যুবকের তিনজন কোনওরকমে ছাড়া পেলেও, ৫ জনকে আটকে দেয় সেনা।
ছাড়া পাওয়া তিন জনই পরে সেনাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেন। তাঁদের বয়ান অনুসারে, ১৬ ফেব্রুয়ারি রাত দেড়টার সময় তালাপ আর্মি ক্যাম্পে ৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায় সেনা। প্রত্যেককে আলাদা ঘরে রাখা হয়।২১ ফেব্রুয়ারি তিনজনকে ছেড়ে দেয় সেনা। ভীত-সন্ত্রস্ত তিন যুবকই সেই সময়  গা ঢাকা দিয়েছিলেন। পরে জানা যায়,সেনাদের হুমকির ভয়েই গা ঢাকা দেন তাঁরা। কী হয়েছিল সেই রাতে?  বলতে গিয়ে এখনও কেঁপে ওঠেন সেদিনের বিভীষিকা থেকে রেহাই পাওয়া প্রকাশ শর্মা, গুইন হাজারিকা ও মোটেশ্বর মোরেণ।
আটক ৮ জনের চোখেই কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল। ৫ যুবককে আলাদা সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের উপর চলা অকথ্য অত্যাচার বুঝতে পারছিলেন প্রকাশ শর্মারা। ৫ বন্ধুর চিৎকার কানে আসছিল তাঁদের। তারপর এক অসম্ভব নীরাবতা। ১৬-১৭ টানা দুদিন অত্যাচারে পর, ৫ জনকেই খুন করে ৭ সেনা। বাকি তিন জনকে মুখ না খোলার হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
২৪ ফেব্রুয়ারি ৫ যুবকের ক্ষত-বিক্ষত দেহ ডাঙ্গরী জাতীয় সড়কের ধারে উদ্ধার হয়। সেনার তরফে বলা হয়, ৫ জনই জঙ্গি, তারাই চা মালিক রামেশ্বর সিংকে হত্যা করেছে। তল্লাশি অভিযানে সেনার গুলিতে নিহত হয়েছে। মৃত ৫ জনের মধ্যে তিন অসম ছাত্র সংগঠন আসু-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাই  সেনাদের কথা বিশ্বাস না করেই মৃত ৫ নীরিহকে খুন করা হয়েছে বলে আন্দোলনে নামে সেই সময়ের ছাত্র সংগঠনটি। মৃতদের পরিবার দাঁতে দাঁত চেপে অই লড়াইয়ে যোগ দেন।
টানা চলা লড়াইয়ে মোড় ঘোরে তিন সাক্ষী প্রকাশ্যে আসার পর। ২০১২ সালে হাই-কোর্ট পরে সুপ্রিম কোর্টেও ৭ সেনা দোষী সাব্যস্ত হয়। আইনি জট কাটিয়ে ২০১৮ সালের ১৩ অক্টোব ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিল আর্মি কোর্টের মার্শাল অ্যাক্ট।
৯৪-এর ২৪ ফেব্রুয়ারি, যে জাতীয় সড়কে ৫ জনের দেহ উদ্ধার হয়, সেখানেই ৫ শহিদ বেদী তৈরি করেছে আসু ছাত্র সংগঠন।  এখনও সেই শহিদ বেদী ঢাকা থাকে ফুলের স্তুপে। অসমের আমজনতা দিনটিকে মনে রাখতে চায় শহিদ দিবস হিসেবেই। তাই ডাঙ্গরীর জাতীয় সড়কের সেই মোড়টি “পঞ্চ শহিদ মেমোরিয়াল” হিসেবেই খ্যাত।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*