নিজস্ব সংবাদদাতা, নদিয়া:
একটি গ্রাম, অথচ সেখানে কালীপুজোর সংখ্যা তিনশোরও বেশি! শুধু সংখ্যার বিস্ময় নয়, এই গ্রামের প্রতিটি বাড়ির কালীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তন্ত্রসাধনার প্রাচীন রীতি। কোথাও পারিবারিক আরাধনা, কোথাও গোষ্ঠীগত আয়োজন, আবার কোথাও কয়েকশো বছরের পুরনো সাধনপদ্ধতি মেনে দেবীর উপাসনা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলেছে পুজোর আয়োজন, কিন্তু বদলায়নি বিশ্বাসের শিকড়। নদিয়ার কৃষ্ণনগর ২ নম্বর ব্লকের ধুবুলিয়ার বেলপুকুর যেন আজও বয়ে নিয়ে চলেছে কয়েকশো বছরের এক জীবন্ত ধর্মীয় ইতিহাস। পরিচিতি তার ‘তন্ত্রগ্রাম’।
কার্তিকী অমাবস্যা এলেই বেলপুকুরের চেনা ছবিটা বদলে যায়। গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত—প্রায় প্রতিটি পাড়া, বাড়ি ও বসতিতে শুরু হয় দেবী কালীর আরাধনা। বর্তমানে স্থানীয়দের হিসেব অনুযায়ী, গ্রামে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০টি কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই বিপুল সংখ্যক পুজোর থেকেও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, প্রতিটি বাড়িতেই তন্ত্রমতে দেবীর পুজো হওয়ার প্রচলন। প্রায় সাড়ে তিনশো থেকে চারশো বছরের পুরনো এই সাধনপরম্পরাই বেলপুকুরকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচয়।
রাজা রুদ্র রায়ের হাত ধরে সূচনা
বেলপুকুরের তান্ত্রিক ঐতিহ্যের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় নদিয়ার ইতিহাসের এক প্রাচীন অধ্যায়ে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই পরম্পরার সূচনা রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপিতামহ রাজা রুদ্র রায়ের সময়। কথিত আছে, একদিন শিকারে বেরিয়ে একটি পুকুরের ধারে বেলগাছের নিচে ধ্যানমগ্ন এক সাধককে দেখতে পান রাজা। তাঁর নাম রামচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি রামচন্দ্র ভট্টাচার্য নামেও পরিচিত ছিলেন।
গৃহস্থ জীবনযাপন করেও গভীর আধ্যাত্মিক সাধনা, পাণ্ডিত্য এবং সিদ্ধিলাভের খ্যাতি ছিল তাঁর। সাধকের ব্যক্তিত্ব ও সাধনশক্তিতে মুগ্ধ হয়ে রাজা রুদ্র রায় তাঁকে গুরু হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, তাঁকে বেলপুকুর গ্রাম দান করেন রাজা। পাশাপাশি এই অঞ্চলে দেবী কালীর আরাধনা এবং তান্ত্রিক সাধনপদ্ধতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকার কথা শোনা যায়। সেই সময় থেকেই ধীরে ধীরে কালীসাধনা হয়ে ওঠে বেলপুকুরের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের অন্যতম প্রধান পরিচয়।

হ্যারিকেনের আলো থেকে আধুনিক আলোকসজ্জা
সময়ের সঙ্গে বদলেছে পুজোর চেহারা। কিন্তু বদলায়নি আরাধনার আবেগ। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দাদের স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের কালীপুজো। সেই সময় অনেক পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের সামর্থ্যও ছিল সীমিত। তবু পুজো বন্ধ থাকত না। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী আয়োজন করা হতো দেবীর আরাধনা।
আলোকসজ্জা বলতে কোথাও হ্যারিকেন, কোথাও মোমবাতি, আবার কোথাও গ্যাসলাইট। ছিল না আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম, ডিজে কিংবা চোখধাঁধানো মণ্ডপসজ্জা। কিন্তু মানুষের মধ্যে ছিল পুজোকে ঘিরে গভীর টান, পারিবারিক মিলন এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। আজ সেই ছোট ছোট আয়োজনের অনেকগুলি বড় পরিসর পেয়েছে। আধুনিক আলোকসজ্জা ও মণ্ডপসজ্জায় সেজে ওঠে গ্রাম। তবে জাঁকজমকের আড়ালেও পুরনো তান্ত্রিক রীতিনীতি ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।
ন’বাড়ির কুলদেবী এক জটা তারা
বেলপুকুরের তান্ত্রিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়গুলির একটি ন’বাড়ির এক জটা তারা। দেবী তারার এক বিশেষ ও উগ্র রূপ হিসেবে তাঁর আরাধনা করা হয়। ন’বাড়িতে তিনি কুলদেবী হিসেবে পূজিতা। এই পরিবারের সাধনপরম্পরা রামচন্দ্র ভট্টাচার্যের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রাজা রুদ্র রায়ের সময় তৎকালীন ঢাকার বিক্রমপুরের কনকসার থেকে তিনি এই অঞ্চলে এসেছিলেন।
ন’বাড়ির পুজোর রীতিতেও রয়েছে বিশেষত্ব। কার্তিকী অমাবস্যার রাতে প্রথমে নিয়ম মেনে দক্ষিণা কালীর পুজো সম্পন্ন হয়। এরপর কালীপ্রতিমা বিসর্জনের পর তারা যন্ত্রের মাধ্যমে দেবী এক জটা তারার উদ্দেশ্যে পালিত হয় একটি বার্ষিক গোপন তান্ত্রিক অনুষ্ঠান। এই বিশেষ উপাসনাপদ্ধতি বেলপুকুরের সাধনসংস্কৃতিকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচয়।
কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতা ও নদিয়ার কালীসাধনা
সাহিত্যিক তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, নদিয়া জেলায় তান্ত্রিক কালীপুজোর প্রসারে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁর উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় কালীপুজোর প্রচলন ও প্রসার ঘটেছিল। ফলে নদিয়ার ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কালীসাধনা বিশেষ স্থান অর্জন করে। বেলপুকুরের দীর্ঘদিনের তান্ত্রিক পরম্পরাকেও সেই বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়।
তন্ত্রসাধনার পাশাপাশি বৈষ্ণব ঐতিহ্যও
বেলপুকুরের ইতিহাসের আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল বৈষ্ণব ধর্মীয় পরম্পরা। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মাতামহ পণ্ডিত নীলাম্বর চক্রবর্তীর সঙ্গে এই গ্রামের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা পরিচিত। গ্রামের মদনগোপাল মন্দির আজও সেই বৈষ্ণব ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। নিয়মিত পুজো ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মন্দিরটি স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব ধরে রেখেছে।
একদিকে দেবী কালীর তান্ত্রিক সাধনা, অন্যদিকে মদনগোপালের আরাধনায় বৈষ্ণব ভাবধারা—দুই ভিন্ন ধর্মীয় দর্শনের এমন সহাবস্থান বেলপুকুরের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

আজকের দিনে বহু প্রাচীন পারিবারিক পুজো এবং লোকাচার যখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, তখন বেলপুকুরে তিনশোরও বেশি কালীপুজোর ধারাবাহিকতা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। প্রতিটি পুজোর পিছনে রয়েছে একটি পরিবারের ইতিহাস, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি এবং বিশ্বাসের উত্তরাধিকার। কয়েকশো বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
আসলে বেলপুকুরের কালীপুজো শুধুমাত্র এক রাতের উৎসব নয়। এটি ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ, সাধনার সঙ্গে বিশ্বাসের মেলবন্ধন এবং পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার এক নিরন্তর প্রয়াস। আলো ঝলমলে মণ্ডপের আড়ালে আজও এখানে বেঁচে রয়েছে প্রাচীন তন্ত্রসাধনার এক বিস্ময়কর অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের নামই—নদিয়ার ‘তন্ত্রগ্রাম’ বেলপুকুর।

Be the first to comment