পিয়ালী :
নীতীশ কুমারের (Nitish Kumar) প্রথম সাক্ষাৎকার নিই ২০০২ সালে। তখন তিনি রেলমন্ত্রী। কেন্দ্রে বাজপেয়ী সরকার। পূর্ব রেলের বিভাজন নিয়ে উত্তাল বাংলা। এর আগে রেলমন্ত্রী হিসেবে তাঁর বিভিন্ন অনুষ্ঠান কভার করলেও সাক্ষাৎকার সেই প্রথম। আমার তখন সাংবাদিকতায় সবে পাঁচ বছর হয়েছে। মনে আছে মালদায় রেলের অনুষ্ঠান শেষে আমার মত বাচ্চা রিপোর্টারকে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন তিনি। প্রাক্তন রেলমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেত্রী তথা বাংলার অগ্নিকন্যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন এই পূর্ব রেল বিভাজন নিয়ে আন্দোলনে। সারা রাজ্য তথা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল বিভাজন বিরোধী এই আন্দোলন। পূর্ব রেলের বিভাজন নিয়ে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম নীতীশ কুমারকে। নীতীশ বলেছিলেন, প্রশাসনিক সুবিধার জন্য পূর্ব রেল বিভাজন আবশ্যিক। হয়েওছিল তাই। সাতটা ডিভিশন নিয়ে তৈরি পূর্ব রেল যার হেডকোয়ার্টার ছিল কলকাতা। তার থেকে তিনটি ডিভিশন ধানবাদ, দানাপুর, মোগলসরাই (দীনদয়াল উপাধ্যায়) চলে গিয়ে হাজীপুরে তৈরি হলো ইস্ট সেন্ট্রাল রেলওয়ে (East Central Railway) হেডকোয়ার্টার। আর কলকাতাকে হেডকোয়ার্টার করে থেকে যায় বাকি চারটি ডিভিশন হাওড়া, শিয়ালদহ, মালদা ও আসানসোল।

তারপর গঙ্গা কোশী নদী দিয়ে অনেক জল প্রবাহিত হয়েছে। হঠাৎ এই প্রসঙ্গের অবতারণা এই কারণে বিহারে ভোট আসন্ন। আর নির্বাচনের মুখে নীতীশ কুমারকে নিয়ে বই লিখেছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর জনসংযোগ যিনি দেখেন সেই মুরলী মনোহর শ্রীবাস্তব। সাংবাদিক লেখক মুরলী গত ৯ বছর ধরে এই জনসংযোগের কাজ দেখছেন।

মুরলীর সঙ্গে আমার আলাপও একটু মজার ব্যাপার। তখন সবে ইন্ডিয়া জোট তৈরি হচ্ছে। প্রথম মিটিং হয় বিহারে। উপস্থিত ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে রাহুল গান্ধী, লালু প্রসাদ যাদব সকলে। নীতীশ কুমারের সরকারি বাংলোতে সেই মিটিং হয়। দিনটি ছিল ২০২৩ সালের ২৩ শে জুন। নির্ধারিত সময়ে এসেও সিএম হাউসে ঢুকতে পারছিলাম না। বাংলার বিভিন্ন চ্যানেলের, কাগজের অনেকেই ঢুকে পড়লো। তাঁদের কথামত নিজের পরিচয়পত্র পাঠিয়েছিলাম। তাঁদের বক্তব্য, আগেই লিস্ট তৈরি হয়ে গেছে। আমি পড়েছি আতান্তরে। আমরা কয়েকজন বাংলার রিপোর্টার তখন রাস্তায় বসে আছি। হঠাৎই মুরলী আসেন।
মুরলী এসে বলেন, আমি দেখছি। কিন্তু তিনি সিএম হাউসে ঢুকে যান, আর বেরোননি। আমিও নাছোড়। কল লিস্ট দেখলে বোঝা যাবে, আমি সেদিন মুরলীকে পর পর কল করে গেছি। পাশাপাশি, বাংলা মিডিয়ার বন্ধুদেরও বারবার কল করেছি, কাতর প্রার্থনা, আমাকে ঢুকতে দাও। কিন্তু তাদের কানে পৌঁছায়নি একথা।
অবশেষে কল এলো। প্রেস মিট শুরু হবে, আপনি পেছনের দরজা দিয়ে সিএম হাউসে ঢুকুন। ত্রাতার নাম মুরলী মনোহর শ্রীবাস্তব।
তাই লেখক সাংবাদিক মুরলীর লেখা বই রিভিউ করা আমার কর্তব্য মনে করি।

বইয়ের নাম ‘বিকাশপুরুষ’। বইয়ের বিষয়বস্তু জানতে কথা হলো মুরলীর সঙ্গে। অকপটে জানালেন, গত কুড়ি বছর ধরে বিদ্যুৎ, জল, রাস্তা অর্থাৎ বিজলী-সড়ক-পানি-তে বিহারের প্রভূত উন্নয়ন করেছেন নীতীশ। একের পর এক উন্নয়নের খতিয়ান দেন তিনি। বলেন অযোধ্যায় রাম মন্দির করেছে বিজেপি কিন্তু রাম-সীতাকে কি আলাদা করা যায়? ৮৮২ কোটি টাকা দিয়ে জানকি মন্দির বিহারের সীতামাড়িতে করেছেন নীতীশ কুমার। বৈশালীতে ৭২ একর জমিতে ৫৫০.৪৮ কোটি টাকা ব্যয় বুদ্ধ দর্শনের অপূর্ব ব্যবস্থা করেছেন নীতীশ। মহিলা স্বশক্তিকরণ (empowerment) নীতিশ কুমারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মহিলাদের ১০ হাজার টাকা দেওয়া, মহিলার রোজগার যোজনা-সহ একাধিক যোজনা করে মেয়েদের উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন নীতীশ। ন্যাশনাল হাইওয়ের (National Highway) সম্প্রসারণের জন্য ৯০০ কোটি টাকা দিয়েছেন নীতীশ কুমার। এছাড়া ক্রীড়াক্ষেত্রেও বিরাট অবদান রেখেছেন নীতীশ কুমার। ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস সার্কিট গঠনে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সরকারি স্কুলগুলি এখনো নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও তার সম্প্রসারণের চেষ্টা করেছেন নীতীশ। মুরলী আমাদের বললেন যে, মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার সাংবাদিকদের পেনশনের বন্দোবস্ত করেছেন এবং তার পরিমাণও যথেষ্ট ভালো। রিটায়ারমেন্টের পর সাংবাদিকেরা ১৫,০০০ টাকা মাসে পেনশন পান। সবচেয়ে বড় কথা বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি করেছেন নীতীশ। ১২৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ প্রত্যেক মানুষ ফ্রিতে পান। এইসব উন্নয়নের কথাই মুরলীর বইতে নীতীশ সম্বন্ধে লেখা আছে।
১০,০০০ মেগাওয়াট সৌরশক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎকে জনগণের জন্য বিনামূল্যে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এই সৌরশক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ বণ্টন সম্পূর্ণ সরকারি খরচে হবে।
এখন নীতীশকে যতই রাজনৈতিক বিরোধীরা পল্টু চাচা বলে সমালোচনা করুন না কেন, কুড়ি বছর ধরে অ্যান্টি ইনকাম্বেন্সি (anti incumbancy) এর মোকাবিলা করে তাঁর জয়যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। মানুষ উপকার পান, তাই তাঁকে ভোট দেন, বললেন মুরলী।

তাই নরেন্দ্র মোদির স্লোগান ‘সাবকা সাথ সবকা বিকাশ সবকা বিশ্বাস’ এই স্লোগানের প্রতিফলন দেখা যায় নীতীশ শাসিত বিহারে।
মুরলীর লেখা ‘বিকাশপুরুষ’ বইটির নামও তাই যথোপযুক্ত। উন্নয়নের মাধ্যমেই নীতীশ সকল মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। মুরলী বলেন, এই বই পড়ুন ও পড়ান সকলকে, শুধু বিহারবাসী নয়, সারা ভারতের লোক জানুক ‘বিকাশপুরুষ’ হিসেবে নীতীশ কতটা সফল।

Be the first to comment