পুজোয় বলি। শুনে মানতে পারেননি স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভু। বলি বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়ে এক শিষ্যকে পাঠিয়েছিলেন হুগলির ধনিয়াখালির (Dhaniakhali) ভান্ডারহাটির জমিদার রামচন্দ্র চৌধুরির বাড়িতে। অনুরোধ ছিল৷ দুর্গাপুজোয় কোনওভাবেই বলি প্রথা চালু না রাখা হয়। পরম্পরা ছাড়তে পারেনি চৌধুরি পরিবার। ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মহাপ্রভুর অনুরোধ। কিন্তু অনুরোধ রাখতে না পারলেও বলির সময় রাজবাড়িতে আয়োজিত হয় হরিনাম সংকীর্তন। প্রায় সাড়ে সাতশো বছর পেরিয়ে সেই প্রথা আজও বহমান। এ বাড়িতে অভয়া রূপে পূজিত হন দেবী দুর্গা। একচালার কাঠামোয় লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, সরস্বতী থাকলেও মায়ের পায়ের নিচে থাকে না অসুর, মহিষ ও সিংহ। মা এখানে দ্বিভূজা। ডাকের সাজে সিংহাসনে বিরাজমানা।
ইতিহাস বলে রামচন্দ্র চৌধুরী ছিলেন উত্তরপ্রদেশের কনৌজের বাসিন্দা। ১২১৯ শকাব্দে তিনি ধনিয়াখালির ভান্ডারহাটিতে এসে বসবাস শুরু করেন। রামচন্দ্র ছিলেন জমিদার। এই গ্রামে তিনিই প্রথম দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। তাঁর আমলে খড়ের চালের ছাউনিতেই পুজো হতো দেবীর। পরবর্তীকালে তা সংস্কার করে বড় পাকা মন্দির নির্মাণ করেন বংশের সদস্য অতুলচন্দ্র চৌধুরী। এই পুজোতে ২৩ রকমের নৈবেদ্য দেওয়া হয় মাকে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী তিনদিন হয় বলি। সপ্তমীর দিন আঁখ, ছাঁচিকুমড়ো ও বাতাবি লেবু বলি দেওয়া হয়। অষ্টমী ও নবমীর দিন হয় পশুবলি। পুরুষরা পুজোর জোগাড় করেন। এ পুজোয় জড়িয়ে রয়েছেন স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভু। শিষ্যকে পাঠিয়ে বলি বন্ধের অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু চৌধুরী বাড়ির প্রবীণরা তা পুরোপুরি না মানলেও তার সম্মান রক্ষার্থে সেই থেকে বলিদানের সময় হয় হরিনাম।
বিসর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক গল্প।হ্যাচাকের আলোয় দশমীর দিন মাকে কাঁধে করে পাড়া ঘোরানো হয়। কিন্তু দু’বছর জেনারেটরের আলোয় প্রতিমা বিসর্জনের ব্যবস্থা করা হলেও সেই আলো নিভে যায়। তারপর থেকে আর জেনারেটর নয়, হ্যাচাকের আলোতেই স্থানীয় তালপুকুরে হয় প্রতিমার বিসর্জন। প্রথমে হয় চৌধুরী বাড়ির প্রতিমা বিসর্জন। তারপর হয় অন্যান্য বাড়ির প্রতিমা বিসর্জন। বিসর্জন করে এসে কলাপাতার উপর লেখা হয় শ্রী শ্রী দুর্গা সহায়। মায়ের প্রণামীতে পড়া শাড়ি ধুতি-মিষ্টি সারা বছর যারা সেবা কার্যের সঙ্গে যুক্ত তাদের বিতরণ করা হয়।

Be the first to comment