রমিত সরকার, নদীয়া : নদীয়ার বহুচর্চিত হাঁসখালি গণধর্ষণ ও খুন মামলায় চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করল রানাঘাট আদালত। মঙ্গলবার আদালতের বিচারক এই নৃশংস ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত তিন অভিযুক্ত— সোহেল গয়ালি ওরফে ব্রজ, প্রভাকর পোদ্দার ও রঞ্জিত মল্লিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। পাশাপাশি, ঘটনার সময়কার স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য সমরেন্দ্র গয়ালকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার মুহূর্তে আদালত কক্ষে আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সাজা শোনার পরেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মৃতার পরিবারের সদস্যরা। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের শেষে ন্যায়বিচার মিলেছে বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও, ক্ষোভ আর শোক একসঙ্গে ফুটে ওঠে তাঁদের চোখেমুখে।
এই মামলার রায়কে ঘিরে মঙ্গলবার সকাল থেকেই রানাঘাট আদালত চত্বরে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। মোতায়েন ছিল বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছিল ব্যাপক কৌতূহল— অনেকে আদালত চত্বরে হাজির হন রায় জানতে।
প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল হাঁসখালি থানার অন্তর্গত এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। অভিযোগ, এক নাবালিকা কিশোরীকে জন্মদিনের পার্টির নাম করে ডেকে নিয়ে গিয়ে প্রথমে গণধর্ষণ করা হয় এবং পরে তাকে খুন করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় কিশোরীকে ফেলে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই তার মৃত্যু হয় বলে তদন্তে উঠে আসে।
এখানেই থামেনি নৃশংসতা। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার প্রমাণ লোপাট করতে অভিযুক্তরা মৃতদেহ পুড়িয়ে দেয়। কোনও ধরনের ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়াই দাহকার্য সম্পন্ন করা হয়, যা এই মামলাকে আরও ভয়াবহ রূপ দেয়। ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে তীব্র শোরগোল পড়ে যায়।
প্রথমে ঘটনার তদন্তে নামে রাজ্য পুলিশ। পরে সিবিআই তদন্তের দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা হয়। হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তভার যায় সিবিআইয়ের হাতে। সিবিআই ঘটনার পুনর্তদন্ত করে ৮৫ দিনের মাথায় রানাঘাট আদালতে ২০৯ পাতার চার্জশিট জমা দেয়। তদন্ত চলাকালীন একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দীর্ঘ শুনানির পর আদালত মোট ৯ জন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে। মঙ্গলবার সেই দোষীদের মধ্যে প্রধান অভিযুক্তদের সাজা ঘোষণা করা হল। এই রায়ের মাধ্যমে হাঁসখালি কাণ্ডে বিচার প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পূর্ণ হল বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।

Be the first to comment