আমরা নারী, আমরা পারি…

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী :
টানা তিন ম্যাচে পর পর হার। বিশ্বজয়ের পর হেরে যাওয়ার কথাটা যদিও মনে রাখতে নেই, কিন্তু সত্যিটা কঠিন হলেও বলতেই হয়। তাছাড়া বারবার হেরে গিয়েও জয়ে ফিরে আসাটা মোটেও সহজ নয়। হারতে হারতে যেগুলি মনের মধ্যে বাসা বাঁধে- ভয়, স্নায়ুর চাপ, যে অবস্থার সামনে দাঁড়াতে হয়; তার সবটুকুই ওঁদের মধ্যে মানে মেয়েগুলির মানে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের মধ্যে ছিল তো বটেই কিন্তু নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে ওঁরা একটা কথাই মাথায় রেখেছিল, একটাই সুযোগ আর সেই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। তাই জয়ে ফেরা ছাড়া ওদের সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। আর সেই পথেই ওরা ঘুরে এসে দাঁড়ালো, ওঁদের মাথায় তুলে দিতে হল জয়ের মুকুট। বার বার হেরে যাওয়াটা ভারতীয় মেয়েদের ক্রিকেট দলের ড্রেসিংরুমের আত্মবিশ্বাসকে যে একটুও বদলে দিতে পারেনি সেটা বেশ বোঝা গেল। স্মৃতি, রিচা, দীপ্তিদের আত্মবিশ্বাসে যে এতটুকু চিড় ধরাতে পারেনি, সেটাও বুঝিয়ে ছাড়লো। শেফালি ভার্মা; যে মেয়েটি শেষ মুহূর্তে বিশ্বকাপ দলে ঢুকে বাজিমাত করে ছাড়লেন, সেই ও কি ভেবেছিল বিশ্বকাপ ফাইনালে তাঁর নাম লেখা হবে ম্যাচের সেরার তালিকায়? চোট পেয়ে ছিটকে যাওয়া প্রতিকা রাওয়াল তিনিও কী ভেবেছিলেন ফের বিশ্বকাপ দলে ডাক পাবেন কিন্তু তিনি মনস্থির করে নিয়েছিলেন, তাঁর এখন করার একটাই কাজ, নিজের খেলাটা খেলতে হবে। তাই কোচ আর ক্যাপ্টেনের থেকে সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার পর সেই বাজিমাত করেই ছাড়লেন মেয়ে। ফাইনালে তাই তাঁর নামের পাশে রয়ে গেল ৮৭ রান আর ২ উইকেট। এগুলো কিন্তু রেকর্ড বা ওই ধরনের কিছু নয়, তাই ওসব কথা বিস্তারিত না বললেও চলে। কারণ, দেখতে গেলে সবার নামের পাশেই ওই রকম কিছু না কিছু লেখা হয়েছে যা ধীরে ধীরে সামনে চলে আসবে। তার আগে দু- দু’বার ফাইনালে পৌঁছেও হেরে যাওয়ার দম বন্ধ করা কষত থেকে মুক্তির রাত, যে রাতে শুধুই বিশ্বকাপ জয় দেখেছে পুরো দেশ। সকাল হওয়ার পরও তারাগুলি জ্বলছে ঝিকমিক করে।


ওয়াংখেড়ের মাঠে ১৪ বছর আগে এমনই একটা দিন ছিল। সেই দিনটিরও তারিখ ছিল দুই। যদিও মাসটি ছিল এপ্রিল। গতকাল বা রবিবার ছিল ২ নভেম্বর। নবি মুম্বইয়ের ডিওয়াই পাটিল স্টেডিয়ামে সোনার অক্ষর দিয়ে লেখা হল আরও একটা ইতিহাস। সেদিন অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি আর তাঁর দল শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জয় করেছিল আর এদিন হরমনপ্রীত কৌরের দল দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৫২ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতে নিল ঘরের মাঠে। জয়ের জন্য দরকার ছিল ব্যাটসম্যানকে ক্রিজ থেকে প্যাভিলিয়নে ফিরিয়ে দেওয়া বা দ্রুত সেই উইকেটটি তুলে নেওয়া, দেখলাম শেষ ক্যাচটাও জমা পড়ল ক্যাপ্টেনেরই বিশ্বস্ত হাতে। এর পরের মুহূর্তগুলি তো ঠিক ঠিক ভাষায় বর্ণনা করা যায় না তাই সেগুলিকে স্মৃতির অ্যালবামে জমিয়ে রাখাই ভাল। কারণ, এক একটি করে বছর ঘুরে ফিরে আসবে আর ক্রিকেটের ভারত স্মৃতির অ্যালবামের পাতা উলটে উলটে সেই ছবি দেখে গর্বে আর খুশীতে মন ভরাবে। যারা কপিল দেবের হাতে ১৯৮৩-র বিশ্বকাপ দেখেছিলাম গত রাতটিও ঠিক তেমনটাই। ঠিক বললাম কি না! ভারতীয় মেয়েদের জয় কী তার থেকে কোনো অংশে কম কিছু, না কোনো তুল্যমূল্য বিচার করা যাবে। আজকের জয় সেই জয়েরই এক্কেবারে সমতূল্য। প্রথম তো একবারই হয়, তাই না।


শেফালি বর্মা ও দিপ্তী শর্মার ব্যাটে ভর করে ২৯৮ রান তোলে ভারত। মেয়েদের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ফাইনালে এর আগে ১৬৭ রানের বেশি লক্ষ্য ছুঁয়ে জিততে পারেনি কোনো দল। তাছাড়া মেয়েদের ওয়ানডে ইতিহাসে দক্ষিণ আফ্রিকাও কখনও এত বেশি রান তাড়া করে জিততে পারেনি। জয় পেতে কঠিন রানের পাহাড়ে চড়তে হত প্রোটিয়াদের। যদিও তাঁরা ২০০ রান পেরিয়েছিল কিন্তু ভারতীয় বোলিং তাঁদের ২৪৬ রানে থামিয়ে দেয়। ভারতের ২৯৮ রানের চ্যালেঞ্জিং পুঁজি। এদিন ফের টস হারেন হরমনপ্রীত কৌর ঠিকই কিন্তু ম্যাচ জিতে, বিশ্বকাপ নিয়েই মাঠ ছাড়ল তাঁর মেয়েরা। তাই আজ শুধু জয়ের কথা, একদল ভারতীয় মেয়ের ক্রিকেট মাঠে অদম্য লড়াইয়ের কথা, যা লেখা থাকবে ইতিহাসে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*