শীত নামতেই বাজারে খেজুরের নলেন গুড়ের চাহিদা বাড়ে। গ্রামগঞ্জে এখনো এই গুড়ের আলাদা কদর আছে। নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের বিভিন্ন গ্রামে শিউলিরা ইতিমধ্যেই খেজুর গাছ ঝোড়া, রস তোলা আর গুড় জাল দেওয়ার কাজে ব্যস্ত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যে নলেন গুড়ের সুনাম ছিল, সেখানে এখন বড় ধাক্কা লেগেছে— কারণ একটাই, ভেজাল।
বর্ষা কাটতেই গাছ ঝোড়ার কাজ শুরু হয়। গাছ প্রতি প্রায় ২০০ টাকা দিয়ে লিজ নেন শিউলিরা। অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন— এই চার মাসই রস তোলা এবং গুড় তৈরির মৌসুম। সপ্তাহে দুই-তিন দিন করে রস তুলে চুল্লিতে জ্বাল দেওয়া, সব মিলিয়ে খরচ আর পরিশ্রম বেশিই। লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে নতুন প্রজন্ম আর এই পেশায় আসতে চাইছে না।
শিবনিবাসের শিউলি বাসুদেব বিশ্বাস জানান, কুড়িটি গাছ থেকে রস মিলে চার হাঁড়ির মতো, যা জাল দিয়ে দুই-তিন কেজি খাঁটি নলেন গুড় হয়। বাজারদর কেজিপ্রতি ২৫০ টাকা। অথচ ভেজালকারীরা সামান্য রসে চিনি মিশিয়ে গুড় তৈরি করছে ৮০–৯০ টাকায়। কম জ্বালানি, কম সময়—তাই লাভও বেশি। একসময় যে মাজদিয়া বাজারে নলেন গুড়ের নাম যেত রাজ্যের বাইরে, সেখানে আজ ভেজালের চাপে সেই স্বাদ আর গন্ধ— দুটোই হারিয়ে গেছে।
মাজদিয়ার ব্যবসায়ী মাধাই ঘোষ জানান, তাঁরা ৮০–৯০ টাকায় গুড় কিনে কলকাতায় ১২০–১৩০ টাকায় বিক্রি করছেন। পাইকারি ব্যবসায়ী অমিত ঘোষের অভিযোগ আরও সরাসরি— “মাজদিয়ার বাজারে এখন সবই ভেজাল গুড়।” তাঁর দাবি, আগে গুড়ের ধারেকাছে গেলেই নলেনের সুগন্ধ পাওয়া যেত, এখন তা নেই। সীমান্ত লাগোয়া বহু গ্রামে ১০ কেজি চিনিতে এক ভার রস মিশিয়ে সহজেই গুড় বানানো হচ্ছে। এতে খরচ কম, সময় কম আর লাভ দ্বিগুণ।
সব মিলিয়ে, সস্তা ভেজাল গুড় বাজার দখল করে ফেলায় বিপাকে পড়েছেন খাঁটি নলেন গুড় তৈরির মানুষজন। নলেন গুড়ের স্বাদ, সুনাম আর পরিচিতি আজ সিরিয়াস সংকটে— ভেজালই সেই গুড়ের সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী।

Be the first to comment