চা বলয় থেকে মোদির কটাক্ষ, পাল্টা মমতার জবাব, ছাব্বিশে ভোটের দামামা বাজিয়ে দিলেন দুজনেই

Spread the love

রোজদিন ডেস্ক, কলকাতা:- ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হল আলিপুরদুয়ারে। প্রায় চার দশক পরে আবার কোনও প্রধানমন্ত্রী এই ছোট শহরের মাটিতে পা রাখলেন। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এসেছিলেন আলিপুরদুয়ারে। ৩৯ বছর পর ২০২৫ সালের ২৯ মে, সেই একই মাটিতে পা রাখলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর বৃহস্পতিবার পা রেখেই ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের এক বছর আগেই ভোটের দামামা বাজিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বুঝিয়ে দিলেন, আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ৫ ইস্যুকে হাতিয়ার করতে চলেছে বঙ্গ বিজেপি। রীতিমতো বাংলায় ভোটের স্লোগানও বেঁধে দিলেন তিনি। অন্যদিকে, গেরুয়া শিবিরের পালটা দিয়ে মণিপুর থেকে নিট দুর্নীতি, হাথরস থেকে বাংলার বকেয়ার কথা তুলে নির্বাচনের লড়াইয়ে ময়দানে নেমে পড়ল ঘাসফুল শিবিরও।
বৃহস্পতিবার আলিপুরদুয়ারের সভা থেকে রাজ্যের জন্য ৫ ‘সংকট’কে চিহ্নিত করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, “এভাবে সরকার চলবে?” প্রধানমন্ত্রীর কথায়, “বাংলাকে ঘিরে রেখেছে অনেক সমস্যা। এক, সমাজের হিংসা ও অরাজকতা। দুই, মা-বোনের নিরাপত্তাহীনতা-তাঁদের উপর হতে থাকা জঘন্য অপরাধ। তিন, বাড়তে থাকে বেকারত্ব। চতুর্থ, মারাত্মক দুর্নীতি, প্রশাসনের উপর মানুষেক বিশ্বাস কমছে। পঞ্চম, গরিবের অধিকার কেড়ে নেওয়া শাসক স্বার্থান্বেষী রাজনীতি।” এরপরেই তাঁর প্রশ্ন, “এভাবে সরকার চলবে?” পাশাপাশি ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের সুরও বেঁধে দিলেন তিনি। নয়া স্লোগান দিয়ে বললেন, “বাংলায় মোদি জি কি পুকার নেহি চাইয়ে নির্মম সরকার।”
এরপরই তৃণমূলের তরফ থেকে পালটা দিয়ে বিজেপির আমলে গোটা দেশের ৫ সংকটের কথা শোনাল রাজ্যের শাসকদল। এক্স হ্যান্ডেলে তারা লিখেছে, ‘মোদিজি পাঁচ সংকটের তালিকা দিয়েছেন। চলুন, এগুলো নিয়েও কথা বলা যাক…।’ এরপরই একে একে মণিপুর, নিট দুর্নীতি, হাথরসের মতো ইস্যুর কথা তুলে ধরে তারা। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে মোদির খোঁচার পালটা তৃণমূলের দাবি, ‘দু’বছর ধরে মণিপুর জ্বলছে। আগে নিজের ভুল শোধরান।’ মহিলা নিরাপত্তা নিয়ে তৃণমূলের হাতিয়ার উত্তরপ্রদেশের হাথরাস-উন্নাওয়ের ধর্ষণকাণ্ড। সঙ্গে খোঁচা, ‘মোদি সরকারের রেকর্ড লজ্জা দেয়।’ যুব সমাজের হতাশা নিয়ে তৃণমূলের পালটা কেন্দ্রের অধীনে থাকা নিটে দুর্নীতি, দেশের ৪৫ শতাংশ বেকারত্ব। মোদি প্রশাসনকে ধুয়ে দিয়ে তৃণমূলের দাবি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অর্ধেক মন্ত্রী তো জামিনে মুক্ত রয়েছেন। তৃণমূল সরকারে স্বার্থপর বলে খোঁচা দিয়েছেন মোদি। জবাবে তৃণমূলের দাবি, ‘মোদি সরকারের প্রতিহিংসার রাজনীতির জেরে বাংলা আবাস যোজনা ও ১০০ দিনের কাজে বকেয়া পায়নি।’ সবমিলিয়ে বিজেপির ‘কুৎসা’র জবাব দিল তৃণমূল।
তারপরই তৃণমূল সুপ্রিমোকে বাংলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কটাক্ষ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে হলে মমতা বলেন, রাজনীতির হোলি খেলতে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর মমতা মোদির দেওয়া পঞ্চবাণের কড়া জবাব দিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন , ‘সিঁদুর বেচতে এসেছেন?’ প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশে করে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদি আগে নিজেকে চা-ওয়ালা বলতেন। পরে বললেন, পাহারাদার! আর এখন সিঁদুর বেচতে এসেছেন?’
এরপর ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে মমতা বলেন, ‘ওই অভিযানের নাম ‘অপারেশন সিঁদুর’ ওঁরা দিয়েছেন। এই নাম দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। যে সময় বিজেপির সমর্থকেরাও দেশের হয়ে গলা ফাটাচ্ছেন, সেই সময় নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসাবে এখানে রাজনীতির হোলি খেলতে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী!’
এরই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এত বড় বড় কথা বলেন। সেনাকে স্যালুট করতে আসবেন ভেবেছিলাম। সিকিমে তো গেলেনই না। ভয় পান নাকি? বিদেশে তো এত ঘুরতেন। প্রচার হওয়া উচিত সেনার। এখনও জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করতে পারেননি কেন? সব দেখানোর জন্য।’
আলিপুরদুয়ারে প্রধানমন্ত্রীর জনসভার পর এনিয়ে তাল ঠোকাঠুকি আরও বেড়েছে। মোদি চা বলয় ছাড়তেই ‘সিঁদুর’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চরম প্রতিক্রিয়া দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অপারেশন সিঁদুর নিয়ে আমি কিছু বলবো না। কিন্তু মনে রাখবেন প্রতিটি নারী সিঁদুরকে সম্মান করেন। তাঁরা সিঁদুর পরেন তাঁদের স্বামীর কাছ থেকে। কিন্তু আপনি তো সবার স্বামী নন। আপনি কেন আগে আপনার স্ত্রীকে সিঁদুর দেন না?’ এই মন্তব্য করার সঙ্গে সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী ফের বলেন, ‘আমি দুঃখিত। এটা আমার বলার কথা ছিল না। কিন্তু আপনি আমাকে বাধ্য করেছেন মুখ খুলতে।’
এরপরই পয়েন্ট ধরে ধরে নমোর জবাব দিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন তুললে তৃণমূলের হাতিয়ার মণিপুর। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “মণিপুর গত দু’বছর ধরে জ্বলছে। নিজেদের ব্যর্থতা দূর করুন।” নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে এদিন আবার তিনি বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ সরকারের একের পর এক ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন।
মমতা এদিন বলেন, “উন্নাও থেকে হাথরস, বিজেপির ট্র্যাক রেকর্ডে শুধুই নীরবতা। প্রকাশ্য রাস্তায় উত্তরপ্রদেশে পর্ন ছবি দেখা যায়। যুব সমাজের হতাশা, নিট দুর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, ৪৫ শতাংশ বেকারত্ব মোদি সরকারের উপহার। দুর্নীতির কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রী! বিজেপি সরকারের অর্ধেক মন্ত্রী জামিনে আছেন। এক্ষেত্রে সমালোচনার কোনও ভাষা নেই। স্বার্থপর সরকার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে ১০০ দিনের আবাস যোজনা-সহ একের পর এক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা রাজনীতি করে দেয় না। এরপরেও এ ধরনের মন্তব্য প্রধানমন্ত্রীর মুখে সাজে না।”
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “আমাদের বাংলায় নারী সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত। আপনি কী করেছেন ? যারা মহিলাদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করেছে আপনি তাদেরকে বিজয়ীর মতো ঘুরিয়েছেন। সোশাল সিকিউরিটি বাংলায় যেমন আছে তেমন সারা বিশ্বে কোথাও নেই।”
এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে ছিল বিষয় ধরে ধরে চোখাচোখা আক্রমণ।
এরপরই মালদা ও মুর্শিদাবাদ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “মুর্শিদাবাদ ও মালদার ঘটনা তো বিজেপি ঘটিয়েছে। যদি তার প্রমাণ চান আমি প্রমাণ দিয়ে দেব। এত বছর ধরে রাজত্ব করছেন, দেশকে কী দিয়েছেন? যে মহিলা ম্যাডাম কুরেশি, তাঁকেও বিজেপি নেতারা অপমান করছেন। পহেলগাঁওয়ে মৃতদের নিয়ে বলা হচ্ছে। কেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। মোদিজির পলিসি হল ডিভাইড অ্যান্ড রুল। আলিপুরদুয়ারের মানুষের উপর ভরসা করতে পারছেন না প্রধানমন্ত্রী। যদি তাঁদের উপর বিশ্বাস থাকতো, তাহলে আসাম, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি থেকে লোক নিয়ে আসতে হতো না। উত্তরবঙ্গের মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছে ওনার প্রতি মানুষের কোনও বিশ্বাস নেই।”
এদিন সুকান্ত মজুমদারকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “অপারেশন সিঁদুরের মতো অপারেশন বেঙ্গল করবেন বলছেন। কী ভেবেছেন, বাংলার সঙ্গে টেরোরিস্টদের মিলিয়ে দিতে চাইছেন! অপারেশন সিঁদুরের মতো অপারেশন বেঙ্গল করবেন? এত সাহস? সব ক্ষমতা তো আপনাদের হাতেই রয়েছে তাহলে কালকেই নির্বাচন করে দেখুন না।”
এদিন দুর্নীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কটাক্ষের জবাবে মমতা বলেন, “যদি কোথাও কোনও দুর্নীতি হয়, তাহলে সরকার তো তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। আপনার সরকারে কত দুর্নীতি আছে? মোদিজি, যখন গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ-সহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে কোনও টেরোরিস্ট পাকিস্তানের জন্য কাজ করে, তখন আপনার সরকার কী ব্যবস্থা নেয়? আসাম সরকার কী করে বলে যে, নাগরিকদের হাতে বন্দুক ধরিয়ে দেবে? আমি তো ভেবেছিলাম আপনি সেনাবাহিনীকে স্যালুট দেওয়ার জন্য আসবেন। কিন্তু সেটা তো করলেন না।”
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘অপারেশন সিঁদুরের’ পরে আমাদের বিরোধীরা সবাই বিদেশে গিয়েছেন আর আপনি এখন এখানে ঘুরে ঘুরে পাবলিসিটি করছেন!
আমাদের দেশকে কেউ আক্রমণ না করলে আমিও যুদ্ধ চাই না। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ওই জঙ্গিদের কেন গ্রেফতার করতে পারলেন না? আজ পর্যন্ত কি তাদের মারতে পেরেছেন?” এদিন আমেরিকা প্রসঙ্গ তুলেও প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করেছেন মমতা। তিনি বলেন, “আমেরিকা বললে এক মিনিটে চুপ করে যান, আর বড় বড় কথা বলেন?”
এরপরই প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “যদি আপনার এত ক্ষমতা থাকে, সাহস থাকে, তাহলে টিভি ডিবেটে বসুন। একদিকে আপনি থাকবেন, একদিকে আমি থাকব। আপনি টেলিপ্রম্পটার ব্যবহার করতে চাইলেও ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু যে প্রশ্ন আসবে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। বাংলা কোনওদিনও বিজেপির হাতে যাবে না।”
অর্থাৎ বলাই বাহুল্য, বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক এক বছর আগে দুই যুযুধান রাজনীতিবিদের রাজনৈতিক ঠোকাঠুকি শুরু হয়ে যাওয়ায় অনেকই ভোটের দামামা বেজে গেলো ভাবেই দেখছেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*