মনরেগার নাম বদল কী কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে না রবীন্দ্র-গান্ধী বিদ্বেষ

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী : এতদিন রাস্তা, শহর ইত্যাদি নামের উপর কোপ পড়ছিল, এবার একশো দিনের কাজ প্রকল্পের নাম বদলে দিতে চলেছে মোদী সরকার। যা নিয়ে তারা সংসদে বিল আনতে চলেছে। উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে ইউপিএ সরকার দেশের গরিব মানুষের জন্য বছরে একশো দিনের কাজ নিশ্চিত করতে যে প্রকল্প চালু করেছিল সেটির নাম দেওয়া হয় মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্য়ারান্টি স্কিম বা মনরেগা। গ্রামীন এলাকায় পুকুর কাটানো থেকে শুরু করে রাস্তা তৈরির কাজ হয়েছে এই প্রকল্পে।কাজ নিয়ে কোনো কোনো মহলে বিরোধী যুক্তি থাকলেও বিগত ২ দশক ধরে দেশের গ্রামীন এলাকায় সাধারণ মানুষের জন্য এই প্রকল্পের যে একটি ভূমিকা ছিল তা অস্বীকার করা যায় না।

সাধারণ মানুষ এই একশো দিনের প্রকল্পের কথাকে জানে মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্য়ারান্টি স্কিম বা মনরেগা (MGNREGA) বলে। ১০০ দিনের কাজের এই প্রকল্পটি কেন্দ্রীয় সরকারের আর পাঁচটি কল্যাণমূলক কর্মসূচির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকল্পটি অদক্ষ শ্রমিকের কায়িক শ্রমের জন্য যে কোনো গ্রামীণ পরিবারকে প্রতি বছর ১০০ দিনের মজুরি কর্মসংস্থানের আইনি গ্যারান্টি দিয়ে থাকে। উল্লেখ্য, অতিমারিতে এই প্রকল্পটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এবার মোদী সরকার এই প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করতে চলেছে। নাম বদলে রাখা হচ্ছে বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড অজিভিকা মিশন, যার ছোট সংস্করণ হল VB G RAM G। লক্ষ্যণীয় এক্ষেত্রেও কৌশলে রাম নাম ঢোকানো হচ্ছে। স্বভাবতই রাজনৈতিক শিবিরে এই নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।
মোদী সরকার শুধু একশো দিনের কাজ প্রকল্পের নাম থেকে মহাত্মা গান্ধীর নাম মুছে ফেলছে তা নয়, প্রকল্পের নিয়ম-কানুনেও বদল হচ্ছে অনেককিছু। কেন নাম বা নিয়ম বদল? যুক্তি হল ভিসন ২০৪৭। পাশাপাশি বলা হয়েছে, একশো দিনের কাজ প্রকল্পে কাজের দিন ১০০ থেকে বাড়িয়ে করা হচ্ছে ১২৫ দিন। সেই কাজের টাকা পাওয়া যাবে এক সপ্তাহের মধ্যে কিংবা কাজ শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে। যদি ১৫ দিনের মধ্যে না পাওয়া যায় তাহলে আন এমপ্লয়মেন্টে অ্যালাউন্স বা বেকার ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। এই প্রকল্পের এখন যে মজুরি দেওয়া হয় তার ১০০ শতাংশ দেয় কেন্দ্রে। এবার সেই হারে কিছু বদল ঘটবে। উত্তরপূর্ব ভারতের হিমালয় সংলগ্ন রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে মজুরির ৯০ শতাংশ দেবে কেন্দ্র। বাকী ১০ শতাংশ দিতে হবে রাজ্য বা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলকে। অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ দেবে কেন্দ্র, মজুরির বাকী ৪০ শতাংশ দেবে রাজ্য। নাম পরিবর্তনের পিছনে যুক্তি যাই থাক, সরকারের যে বেশ খরচ-খরচা হবে তাতে সন্দেহ নেই। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও পশ্চিমবঙ্গে ১০০ দিনের প্রকল্পের টাকা আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। তবে এও তো ঠিক যে ১০০ দিনের কাজের টাকা নিয়ে নয় ছয় করেছে রাজ্য সরকার। শুধু তাই নয় এবার থেকে রাজ্যে কোথায় ১০০ দিনের কাজ হবে তা ঠিক করে দেবে কেন্দ্রই। এছাড়া, কাজের পরিকল্পনায় জিআইএস টুলস, পিএম গতিশক্তি লেয়ার ও কেন্দ্রীয় ডিজিটাল স্ট্যাকের উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে স্থানীয় পঞ্চায়েতের ভূমিকা কমে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে। কৃষির পিক সিজনে ৬০ দিন পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখার প্রস্তাবও আছে। এতে ডিমান্ড-ড্রিভেন প্রকল্পটি কেন্দ্রের নর্মেটিভ অ্যালোকেশনে পরিণত হবে, শ্রমিকদের অধিকার কমবে।
অনেকে কেন্দ্রের ১০০ দিনের কাজের কর্মসূচি থেকে ‘মহাত্মা’কথাটি তুলে দেওয়ার দেওয়ার পদক্ষেপে বিজেপির রবীন্দ্র বিদ্বেষ বলে মনে করছেন। গান্ধীজিকে দেশবাসী যেমন ‘বাপু’ নামে সম্বোধন করলেও রবীন্দ্রনাথের দেওয়া ‘মহাত্মা’ নামেও তিনি সমধিক পরচিত। ১০০ দিনের কাজ তথা ‘মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন’ প্রকল্পের নাম থেকে ‘মহাত্মা’ কথাটি বাদ দেওয়া এক অর্থে রবীন্দ্রনাথকে অপমান করা বলেই তাঁরা মনে করছেন।

উল্লেখ্য, কিছুদিন আগে আসামের শ্রীভূমি জেলায় কংগ্রেস কার্যালয়ে সেবাদলের অনুষ্ঠানে বিধুভূষণ দাস নামে এক প্রবীণ কংগ্রেস কর্মী রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি গাওয়ায় সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা আসাম পুলিশকে সে রাজ্যের কংগ্রেস কর্মীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর, গ্রেফতার, এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত আসামে পরিবেশন করা কিছুতেই মেনে নেওয়া যাবে না। বিজেপি বলছে, এই গানটি গাইলে নাকি তা ‘ভারত-বিরোধী’ কাজ! এই কথা যতখানি দেশপ্রেমিক রবীন্দ্রনাথকে অপমান ততটাই ভারত বিরোধীতা, দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস তো বিজেপি অস্বীকার করে কারণ, আরএসএস মনেপ্রাণে ব্রিটিশকেই সমর্থন করেছিল, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তাদের একজনও কেউ অংশ নেয়নি।

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের আনা ‘বঙ্গভঙ্গ’ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যখন ‘স্বদেশী আন্দোলন’ চলছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ এই গানটি রচনা করেছিলেন, গানটি ব্রিটিশ বিরোধী ‘স্বদেশী আন্দোলন’-এ এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছিল। সেই ইতিহাসকে বিজেপি অসম্মান-অপমান করে। বিজেপি-আরএসএস সম্মিলিতভাবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে ধ্বংস করতে চাইছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির চক্ষুশূল। অন্যদিকে সিদ্দারামাইয়ার মতো বিজেপির অভিযোগ, মহাত্মা গান্ধী হিন্দু বিরোধী ছিলেন। তিনি অস্পৃশ্যতা ও বৈষম্যের মতো সামাজিক কুসংস্কারের সংস্কার এবং নির্মূল চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি রামের নাম জপ করেছেন। সাম্প্রদায়িক ঘৃণায় অন্ধ নাথুরাম গডসে গান্ধীজিকে গুলি করে হত্যা করার পরও গান্ধীজি ‘হে রাম’ বলেছিলেন। আসলে বিজেপি জাতি ও ধর্মের ভিত্তিতে সমাজকে বিভক্ত করতে আর গান্ধী ছিলেন যার বিরোধী।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*