সাংয়ে করে প্রতিমা নিরঞ্জন: কৃষ্ণনগরের এক জীবন্ত ঐতিহ্য

Spread the love

সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর:

কৃষ্ণনগর শহরের পুজো মানেই শুধু শোভামণ্ডপ, শিল্পে সাজানো প্রতিমা বা ঢাকের তালে তালে আনন্দ নয়—এই শহরের পুজো মানে আরও এক অনন্য ঐতিহ্য, যার নাম ‘সাং’। কাঁধে করে প্রতিমা নিরঞ্জনের এই প্রথা আজও কৃষ্ণনগরের পুজো সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে আছে।

মূলত জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় সাং-এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তবে কালীপুজো ও সরস্বতী পুজোতেও এখন এই ঐতিহ্য বজায় আছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে প্রায় ৪৫টি জগদ্ধাত্রী পুজোয় সাং ব্যবহৃত হয়েছিল, আর এবছরের কালীপুজোয় সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২-তে। সরস্বতী পুজোর সময় সাং-এর সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়ে যায়।

ট্রাক বা গাড়ির শোভাযাত্রা নয়—এখানে প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা হয় মানুষের কাঁধে করে। ভক্তরা প্রতিমাকে নিয়ে যান শহরের ঘাটে, ঢাকের তালে তালে নাচতে নাচতে, নানা স্লোগান দিতে দিতে। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে মহিলাদের উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনি যেন মিশে যায় শহরের হাওয়ায়। একদিকে প্রতিমার নাচ, অন্যদিকে ভক্তদের চোখে ভক্তি আর আবেগ—এই দুই মিলেই কৃষ্ণনগরের নিরঞ্জন পর্ব হয়ে ওঠে এক অনন্য দৃশ্য।

‘জগদ্ধাত্রীর উৎস সন্ধানে’ গ্রন্থের লেখক সুপ্রতীম কর্মকার বলেন, “সাং মানে কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্য। রাজার আমল থেকেই এই প্রথা চলে আসছে। জলে ভিজিয়ে, রোদে পুড়িয়ে, তেল মেখে দুটি বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয় সাং। ২০২১ সালে কৃষ্ণনগরবাসী সাং প্রথা রক্ষার দাবিতে যে আন্দোলন করেছিল, তা গোটা বাংলার নজর কেড়েছিল।”

স্থানীয় বাসিন্দা অনিল বিশ্বাস বলেন, “সাং মানে কাঁধে প্রতিমা নিরঞ্জন। এটা শুধু রীতি নয়, ভক্তির প্রকাশ। আগেকার দিনে যেমন রানিমাদের পালকিতে করে নিয়ে যাওয়া হতো, তেমনি আজও আমরা দেবীকে রানিমার মতো কাঁধে তুলে বিসর্জনে নিয়ে যাই।”

রাজার আমল থেকে চলে আসা এই সাং প্রথা এখন শুধু কৃষ্ণনগরের নয়, বহু জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কৃষ্ণনগরই এই সংস্কৃতির জন্মভূমি। বাঁশ, দড়ি, ঘাম, ভক্তি আর সুরের মিলনে তৈরি এই প্রথা আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলেছে—ঐতিহ্যের সঙ্গে ভক্তির মেলবন্ধনের প্রতীক হয়ে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*