জন্মদিনে স্মরণ করলেন তপন মল্লিক চৌধুরী :
“ঠিকানা আমার চেয়েছ বন্ধু –/ ঠিকানার সন্ধান, / আজও পাও নি? দুঃখ যে / দিলে করব না অভিমান? / ঠিকানা না হয় না নিলে বন্ধু, / পথে পথে বাস করি/ কখনো গাছের তলাতে / কখনো পর্ণকুটির গড়ি।…” সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় সুরারোপিত এই গানটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে প্রথম প্রকাশিত (১৯৫৬) হওয়ার পর তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু এই কবিতায় পঞ্চাশের দশকেই সুরারোপ করেছিলেন অন্য আরেক সঙ্গীতগুণী এবং বাংলা গানের কারিগর। পঞ্চাশের দশকেই তিনি তাঁর গানের দল নিয়ে ‘আইপিটিএ’-এর বিভিন্ন সম্মেলনে, মেডিক্যাল কলেজের সোশ্যালে, যুব উৎসবে, মার্কাস স্কোয়্যারের বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে গানটি পরিবেশন করতেন। নিজেও ছিলেন সুকন্ঠের অধিকারী। তখন তাঁর সুরারোপিত ‘ঠিকানা’ গানটি যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু অজানা কারণে গানটি যথেষ্ট জনপ্রিয় হলেও সুরকার হিসেবে তাঁর কথা আড়ালেই থেকে যায়। কেউই আর সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ঠিকানা’ প্রসঙ্গে তাঁর কথা বলেন না। তিনি আধুনিক বাংলা এবং সিনেমার গানে নতুনত্ব ও স্পন্দন সৃষ্টিকারী সুধীন দাশগুপ্ত।

বাংলাদেশের যশোহর জেলার বড়কালিয়ায় জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর শৈশব কেটেছিল দার্জিলিং-এ। সুধীন্দ্রনাথ প্রায়শই ভবানীপুর ক্লাবে আসতেন হকি খেলতে। ব্যাডমিন্টনও খেলতেন চমৎকার। তিনবারের রাজ্য ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। অনেকেই মনে করতেন, গানের জগতে না এলে হয়ত হকি বা ব্যাডমিন্টনের উজ্জ্বল তারকা হতেন। আবার সেতার, পিয়ানো, বাঁশি প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রতেও অসামান্য প্রতিভাধর ছিলেন। সুধীন্দ্রনাথ লন্ডনের রয়্যাল স্কুল অব মিউজিক-এ সঙ্গীত বিষয়ে পোস্ট-গ্রাজুয়েশন করেন। বিলেত থেকে ফিরে আসার পর দার্জিলিংয়ে বিরাট ধসের কারণে তাঁর গোটা পরিবারকে কলকাতায় চলে আসতে হয়েছিল। ব্রিটিশ-দার্জিলিংয়ের সাহেবি পরিবেশে বেড়ে ওঠা সুধীন্দ্রনাথ অনেক দিন পর্যন্ত ভাল বাংলা জানতেন না। নেপালি ও ইংরেজি যতটা জানতেন ততটা বাংলা নয়। কিন্তু সুধীন্দ্রনাথ শিক্ষক রেখে বাংলা রপ্ত করেছিলেন। কলকাতায় সেই সময়কার বিখ্যাত গীতিকারের কাছে তিনি যেতেন যাতে ভাল বাংলা লিখতে পারেন। কিন্তু গানের প্রসঙ্গ এলেই তাঁরা এড়িয়ে যেতেন। এতে সুধীন্দ্রনাথের জেদ চেপে গিয়েছিল, সেই জেদের থেকে নিজে গান লিখতে শুরু করেছিলেন। কেবল পাশ্চাত্য সঙ্গীতের শিক্ষাই নয়, এনায়েত খানের বাজনা শুনে সেতার শিক্ষা, ভাতখণ্ডে-চর্চায় ভারতীয় মার্গ-সঙ্গীত, দেশিবিদেশি লোকসঙ্গীত এমনকি কীর্তনাঙ্গ গানেও তিনি নিজেকে শিক্ষিত করেছিলেন।
কলকাতায় তাঁর ঠিকানা ছিল সিঁথি অঞ্চলে। আর কাজ শুরু নলিন সরকার স্ট্রিটের এইচ এম ভির দপ্তরে কমল দাশগুপ্তের সহকারী হিসেবে। ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন ভারতীয় গণনাট্য আন্দোলনের সঙ্গে। গণনাট্য সংঘের জন্যই তৈরি করেছিলেন ‘ওই উজ্জ্বল দিন ডাকে স্বপ্নরঙিন’, ‘স্বর্ণঝরা সূর্যরঙে’, ‘এই ছায়াঘেরা কালো রাত’-এর মতো গান। পরবর্তীতে সুবীর সেনের কণ্ঠে রেকর্ড করা হয় ‘স্বর্ণঝরা সূর্যরঙে’এবং ‘ওই উজ্জ্বল দিন’। ১৯৫৩ সালে তার সুর করা প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। শিল্পী ছিলেন বেচুদত্ত। ১৯৫৩ সালেই তিনি প্রথম বাংলা সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনা করেন ‘উল্কা’ছবির জন্য। বাংলা আধুনিক কবিতায় সুরারোপ করার একটা ধারা জন্ম নিয়েছিল। যেমন সলিল চৌধুরীর ‘অবাক পৃথিবী’, ‘রানার’ইত্যাদি। একই পথে হাঁটেন সুধীন্দ্রনাথও। প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্ঠে যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর’, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘থই থই শাওন এল ওই’, গীতা দত্তের কণ্ঠে বটকৃষ্ণ দে-র ‘কৃষ্ণচূড়া আগুন তুমি’ আজও বাংলা গানের ভাণ্ডারে মণিমুক্তো হয়ে রয়ে গিয়েছে।
পঞ্চাশের দশকের শেষেরদিকে সুধীন দাশগুপ্তকে গীতা দত্ত এবং গুরু দত্ত তাদের বোম্বের (মুম্বাই) প্রোডাকশন হাউসে যোগদান করবার জন্য আমন্ত্রণ করেছিলেন। সুধীন্দ্রনাথের আশা ছিল তিনি গুরু দত্তের ‘পিয়াসা’ ছবিতে হয়ত সুরারোপ করার সুযোগ পাবেন কিন্তু সে আশা তাঁর পূরণ হয়নি। এমনকি তিনি কিশোরকুমারকে ভেবেই দুটি বাংলা গান লিখে সুর তৈরি করেছিলেন কিন্তু কিশোরকুমার তাঁর সঙ্গে দেখাই করেন নি। পরবর্তীতে ইতিন ভূবনের পারে’ ছবিতে “আমি তার ঠিকানা রাখিনি” গানটি তৈরি করে বদ্ধপরিকর ছিলেন যে কিশোর কুমার দিয়েই গাওয়াবেন কিন্তু সে সাধও তাঁর অপূর্ণ থেকে যায় যদিও মান্না দে ওই গানটি তাঁর অসামান্য স্বরমাধুর্য ঢেলে গেয়েছিলেন। একথা তো বলাই যায় যে আসামের-বাঙালী সুবীর সেন বিখ্যাত হয়েছিলেন সুধীন দাশগুপ্তের ‘এত সুর আর এত গান’ থেকে। মান্না দে তখন বম্বেতে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হলেও বাঙলা সিনেমার গান প্রথম সুধীন দাশগুপ্তের সঙ্গীত পরিচালনায় ‘শঙ্খবেলা’ ছবিতে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থাকতে উত্তমকুমার অন্য কারও গান গাইবেন সেটা সেই সময় কেউ মানতে পারেনি; কিন্তু ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’; ধারাটা বদলে দিলেন দিয়েছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত। প্রসঙ্গত, বিমল রায়ের ‘মধুমতী’(১৯৫৮) ছবির সলিল চৌধুরির সুরে ‘সুহানা সফর’ অনবদ্য এবং অসামান্য। সুরটা কিন্তু সলিল বন্ধু সুধীনের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলেন। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া সুধীনের সুরে ‘ছায়াঘেরা কালো রাতে’ ইউ-টিউবে শুনে নিতে পারেন।
প্রায় পঞ্চাশটি বাংলা ছবিতে গান লেখা, সুর করা ছাড়াও অসংখ্য বাংলা আধুনিক গানের কারিগর হয়েও কিন্তু এই পোড়া দেশে সুধীন দাশগুপ্তের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীকে লোকের বাড়ির দরজায় দরজায় ঘুরে শাড়ি বিক্রি করতে হয়েছিল। কারণ স্বভাবে অন্তর্মুখী ও স্বল্পবাক মানুষ সুধীন দাশগুপ্ত ছিলেন আপাদমস্তক ভদ্রলোক যাকে কেউ উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখেনি কখনও, তিনি তাঁর প্রাপ্য সাম্মানিকটুকুও মুখ ফুটে চাইতে পারেননি কোনোদিন।

Be the first to comment