হাজার হাজার বিমানযাত্রী দুর্ভোগ পোহালেও সে বৃহত্তম এবং জনপ্রিয়

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী : 
বৃহত্তম বিমান পরিষেবা সংস্থা (যাত্রী পরিবহন ও বিমান বহরের আকারে) যেটি কম খরচে পরিষেবা দেওয়ার জন্যও পরিচিত তাদের শত শত ফ্লাইট বাতিল হল। শুধুমাত্র একদিনেই হাজারেরও বেশি বিমান বন্ধ রাখা হয়। তার আগের দিনও ৫৫০টির বেশি বিমান বাতিল হয়। ফলে চরম যাত্রী হয়রানি। বিদেশ থেকে বহু যাত্রী আসার পর কানেক্টিং ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাওয়ায় চূড়ান্ত দুর্ভাগের মুখে পড়তে হয় যাত্রীদের। পরিষেবা নিয়ে ক্ষুব্ধ হয় যাত্রীরা। বিমান পরিষেবা স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় কলকাতা-বেঙ্গালুরু ফ্লাইটের ভাড়া ৮ হাজার থেকে হয়ে দাঁড়ায় এক লক্ষ। নয়াদিল্লি-কলকাতা ৭ হাজারের বদলে হয় ৮৪ হাজার। মুম্বই-কলকাতা ৮ হাজার থেকে হয়ে যায় ৪৮ হাজার। সেই মুহুর্তে কেন্দ্রীয় সরকার দাঁড়িয়ে থাকে দর্শক হয়ে। একটি বিমান সংস্থার মোনোপলি যদি এই রকম পরিস্থিতি তৈরি করে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য শিল্পের কী হবে?
সংস্থাটির সিইও এই অবস্থার ত্রুটিকে ‘সিস্টেম রিবুট’ বা প্রযুক্তিগত বলে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর দাবি, নতুন করে সময়সূচি সাজাতে গিয়েই এই বিপত্তি। আসলে কী তাই? না কি আসল ককপিটের ভেতরে পাইলট ও ক্রু সদস্যের তীব্র সংকট। কারণ ‘রিবুট’ বা রোস্টারিং সমস্যা বিষয়টি শোনা গিয়েছিল গত নভেম্বর মাসে। পাইলটদের ক্লান্তি দূর করতে অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক (DGCA) নতুন ‘ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশন’ (FDTL) নিয়ম চালু করে। সোজা কথায় পাইলটদের বিশ্রামের সময় বাড়ানো হয়েছে। আর তাতেই ওই বিমান সংস্থার পুরনো হিসেব-নিকেশ ওলট-পালট হয়ে যায়। সংস্থাটি একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয় কারণ পর্যাপ্ত পাইলট নেই। আর সে কারণে প্রযুক্তির ব্যাখ্যা সামনে হাজির করা যা স্রেফ নিজেদের অব্যবস্থাকে আড়াল করা কিন্তু সে চালাকি শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে। পরে ডিজিসিএ-র কড়া নির্দেশ দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দেয়, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু তা কী এখনও সম্পূর্ণভাবে হয়েছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ‘টার্বুলেন্স’ বা ঝাঁকুনি পুরোপুরি সামলে উঠতে সময় লাগবে, নতুন বছরের ফেব্রুয়ারির আগে স্বাভাবিক ছন্দ ফেরার আশা কম। প্রশ্ন, দেশের এক নম্বর বিমান পরিষেবা সংস্থা কি তাহলে লাভের অঙ্কের দিকে বেশি মনোসংযোগ করাতে যাত্রী পরিষেবা উপেক্ষা করল? এর উত্তর মিলবে না।
যে বিমান সংস্থার বিপুল বিপর্যয়ে চূড়ান্ত দুর্ভোগের শিকার হতে হয়েছিল যাত্রীদের সেই ইন্ডিগো হল ভারতের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় এয়ারলাইন। অবশ্যই তাই কিন্তু তাকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলা যাবে কি না সেটা নির্ভর করছে আপনি আমি নির্ভরযোগ্যতা’ বলতে কী জানি বুঝি তার উপর। ইন্ডিগো তাদের বিশাল বাজার শেয়ার, সময়ানুবর্তিতা এবং কম দামের জন্য পরিচিত, অন্যদিকে এটি Gen Z-এর পছন্দের তালিকায় শীর্ষে এবং একটি ৪-স্টার রেটিংপ্রাপ্ত বাজেট এয়ারলাইন। এদের অভ্যন্তরীণ বাজারে একটি বড় শেয়ার রয়েছে। বলা দরকার, বিমানে যাতায়াত এখন আর আগের মতো শুধুই ধনী বা অভিজাতদের একচেটিয়া নয়। আজকাল প্রচুর সাধারণ মানুষ খুব প্রয়োজনে বিমানে যাতায়াত করতে বাধ্য হন। ঠিক এরকম একটি ক্ষেত্রে ইন্ডিগোর ‘সিস্টেম রিবুট’ কেলেঙ্কারি দেশের সাধারণ যাত্রীদের উপর একটা ভয়ংকর প্রভাব ফেলে দিয়ে গেল। তারা ফের জানলেন, যে আমাদের দেশের শিল্পক্ষেত্রে সে বিমান কিংবা ওষুধ যাই হোক না কেন একজন বা দু’জন শিল্পপতির দাদাগিরি চলে এবং তাদের দাদাগিরির ফলে কী দুর্দশার মধ্যে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। কিন্তু আমাদের সরকার তাদের দাদাগিরিকে সবসময়েই সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে এসেছেন। ইন্ডিগো এয়ারক্র্যাফটের সংখ্যা যেখানে ৪১৭, সেখানে বাকি চারটি সংস্থার মোট এয়ারক্র্যাফটের সংখ্যাই অত নয়। এয়ার ইন্ডিয়া ১৮৭, এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস ১১৫, স্পাইসজেট ৩৫, আকাশা ৩০। প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা ছেলেখেলা, এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।
ইন্ডিগোর সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে ভারতের বৃহত্তম বিমান পরিষেবা সংস্থা, সবচেয়ে জনপ্রিয় এয়ারলাইন এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলা হলেও তাদের মকুটেই জুটেছিল বিশ্বের নিকৃষ্টতম বিমানসংস্থার ‘সম্মান’। এয়ারহেল্প’ নামে একটা সংস্থা সারা বিশ্বের বিমান সংস্থাগুলির মান নিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছিল বছর খানেক আগে। ওই সমীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০৯টি বিমান সংস্থার মধ্যে ১০৩ এ স্থান হয়েছে ইন্ডিগো-র। প্রতিবেদন জানায়, বিমান সংস্থাগুলির মধ্যে ইন্ডিগো স্কোর করেছে ৪.৮০ শতাংশ। ভারতীয় সংস্থাগুলির মধ্যে ইন্ডিগো ছাড়াও এয়ারহেল্পের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছিল এয়ার ইন্ডিয়া। এয়ার ইন্ডিয়া ৬.১৫ শতাংশ স্কোর নিয়ে ৬১তম অবস্থান পেয়েছিল। ৮.১২ স্কোরে তালিকায় প্রথম হয় ব্রাসল্স এয়ারলাইন্স। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয় যথাক্রমে কাতার এয়ারলাইন্স (৮.১১) এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স (৮.০৪)। যদিও এয়ারহেল্পের প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ইন্ডিগো কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন তুলেছিল কিন্তু ওই পর্যন্তই।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*