নেপালের দায়িত্ব নিলেও সামাল দেওয়াই সুশীলা কার্কির আসল চ্যালেঞ্জ

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী :

নেপালে জেন জি বিক্ষোভ আন্দোলনের সময় সে দেশের গণতন্ত্রের প্রতিটি স্তম্ভেই আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাদ যায়নি কাঠমান্ডুর কোনো ছোট বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সুরক্ষিত ছিল রাজকীয় প্রাসাদ নারায়ণহিতি ও জ্ঞানেন্দ্রর বাসভবন। এই অবস্থায় অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছিল নেপাল কি তবে ফের রাজতন্ত্রের পথেই হাঁটছে। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে রাজতন্ত্রপন্থীরাও আওয়াজ তুলেছিল। সেনাপ্রধানের কথা মতো প্রধানমন্ত্রী ওলি ইস্তফা দেন কিন্তু প্রেসিডেন্ট পৌডেল সে পথে হাঁটেন নি। প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল স্রদিন তাঁর সাহস ও বিচক্ষণতায় পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন। সেনাপ্রধানের কথা মতো সেদিন তিনি পদত্যাগ করলে নেপালে রাজতন্ত্র ফিরতে পারতো অথবা সে দেশটির ক্ষমতা চলে যেতো সেনাশাসকদের হাতে। কিন্তু এরপরও যে সেই দেশটির রাজনৈতিক সঙ্কট কেটেছে এমন কথা কি বলা যায়? কারণ নেপালে ফের রাজতন্ত্র ফিরে আসা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই গিয়েছে। জেন জি আন্দোলনের নেতারাই জানিয়েছেন, সেনাপ্রধানের সঙ্গে আলোচনার সময়ে সেনাপ্রধান রাজতন্ত্রের সমর্থক দুর্গা প্রসাই, রবি লামিছানের দল আরএসপি এবং রাজতন্ত্রের সমর্থক আরেকটি দল আরসিপিকেও ডেকেছিলেন। তখনই জেন জি’রা ভাবতে শুরু করে ক্ষমতা কোথায়, কার হাতে যাচ্ছে। এরপরই তারা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও সরকারের প্রধান হিসেবে সুশীলা কার্কির নাম প্রস্তাব করে।

জানা গিয়েছে নেপালে বিক্ষোভ আন্দোলনের পর কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন শাহই সুশীলা কার্কির নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কেবল তাই নয়, সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনা এবং সংসদ ভেঙে দেয়ার দাবিও নাকি তিনিই করেছিলেন। তবে অনেকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করার পরে বেসামরিক সরকার গঠনের দায়িত্ব ছিল প্রেসিডেন্টের উপর সেনাপ্রধানের উপর নয়। কিন্তু বালেন শাহ প্রেসিডেন্টকে উপেক্ষা করায় বোঝা যায়, পর্দার আড়ালে অন্য কোনও খেলা চলছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সেদিন প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেলের বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার জন্যই নেপালে রাজতন্ত্র ফেরেনি। রামচন্দ্র পৌডেলে জেন-জি নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সেনাশাসকদের হাত থেকে যেমন নেপালের ক্ষমতা রক্ষা করেছিলেন একই সঙ্গে রাজতন্ত্রকেও ফিরিয়েছেন। কিন্তু তারপরও যে সেই দেশটির রাজনৈতিক সঙ্কট পুরোপুরি কেটেছে সেকথা বলা যাচ্ছে না। বরং জেন জি আন্দোলনের পর দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়েছে। প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার (তিন সদস্যের মন্ত্রিসভা) গঠিত হলেও নতুন সরকার এই মুহুর্তে বিরাট চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে। অন্তর্বর্তী সরকারকে সংসদ ভেঙে দেওয়া, আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ২০২৬ সালের ৫ মার্চ নির্বাচন সম্পন্ন করা এবং বিক্ষোভ আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো পুনর্গঠন করতে হবে।

যদিও সুশীলা কার্কি ঘোষণা করে দিয়েছেন যে ৫ মার্চ নির্বাচন হবে। কিন্তু সেই নির্বাচন নিয়ে অনেকেই এখনও আশ্বস্ত হতে পারছেন না। তাদের বক্তব্য, নেপালের এখন যা পরিস্থিতিতে তাতে ছ’মাসের মধ্যে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড় তৈরি হয়েছে। দেশে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এতসব চাপ কি প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি সামল দিতে পারবেন? যদিও ছাত্র সমাজ ও তরুণ নাগরিকেরা সুশীলা কার্কিকেী সমর্থন জানিয়েছে, তা স্বত্বেও  নেপালের নতুন এই সরকারের গঠন নিয়ে যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে একথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। কিছু তরুণ নিরপেক্ষতা দেখে উৎসাহিত হলেও, অনেকেই এখনও দ্বিধাগ্রস্ত। এখনও নানা মতবিরোধ এবং বিতর্ক রয়েছে যা ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত বদলের কারণ হতে পারে। যদিও সুশীলা কার্কি এর আগের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাদের পথে না হেঁটে, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসেছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যেমন ডিসকর্ড ব্যবহার করে জেন জ়ি আন্দোলনের সংগঠকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। হাসপাতালে গিয়ে আহত বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দেখা করেছেন। যা কেবল রাজনৈতিকভাবেী গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে না, একটি মানবিক অবস্থানকেও সামনে আনে। তবু, আন্দোলনকারিদের মধ্য তরুণ যারা তারা দ্বিধা সম্পূর্ণ কাটেনি। ‘হামি নেপাল’-এর মতো সংগঠনগুলি পথে নেমে আন্দোলন করায় যথেষ্ট জনসমর্থন পেলেও তারা সরকারে যোগ দিতে বা কোনও মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করতে রাজি নয়। হতে পারে তারা রাজনৈতিক সহাবস্থানের আস্থাশীল নয় অথবা তাদের এই অবস্থান নিজেদের আদর্শগত নিরপেক্ষতা রক্ষা করার প্রচেষ্টা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থান রক্ষা করা বস্তুত অসম্ভব। বোঝা মুশকিল তারা রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেবে নাকি প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলবে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মত, নেপালে সুষ্ঠু নির্বাচন ও পুনর্গঠনের জন্য ভারত, চীন, আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, জাপান ও কোরিয়ার মতো অংশীদারদের সহায়তা জরুরি। বাইরের বাস্তবতা ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পারার কারণে নেপালের পররাষ্ট্রনীতি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত। বাইরের পৃথিবী নেপালকে কিভাবে দেখছে সেটা বুঝতে হবে। অন্যরা আমাদের কেমনভাবে দেখছে। বিক্ষোভ আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত নেপালের পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক দুনিয়ার আস্থা অর্জন খুবই জরুরি। যেহেতু বর্তমান সরকার তীব্র আন্দোলনের কারণেই তৈরি হয়েছে, তাই প্রতিবেশী দুই দেশ ও বৃহত্তর বিশ্বশক্তির আস্থা অর্জন এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত রাখা আবশ্যক। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ভালোভাবে সামলানো না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। ফলত সুশীলা কার্কির নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হল ভূ-রাজনৈতিক চাপকে সামল দেওয়া অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও আদায় করতে হবে। এবং অবশ্যই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*