বদলি ইস্যুতে সরব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংগঠনগুলি, রাজ্যপালকে চিঠি দেওয়ার ঘোষণা

Spread the love

বিউটি চাঁদ : 

সম্প্রতি বিধানসভায় পাস হয়েছে ‘পশ্চিমবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ (নিয়ন্ত্রণ ও প্রবিধান) সংশোধনী বিধি, ২০২৬’ এবং ‘পশ্চিমবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ সংশোধনী বিল, ২০২৬’। রাজ্য সরকারের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতেই এই পরিবর্তন। তবে এই সংশোধনী নিয়ে আপত্তি তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষক প্রতিনিধি, গবেষক এবং বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের সদস্যরা।
তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলা হলেও এই ব্যবস্থার ফলে ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার স্বাধিকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিকাঠামোয় হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্রয়োজন অনুযায়ী এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকদের বদলি করা যেতে পারে। সরকারের তরফে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, রাজ্যের এমন কিছু বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যেখানে শিক্ষক সংখ্যা খুবই কম। কোথাও মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন, আবার কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও বিভাগে শিক্ষক সংখ্যা ৪১ জন পর্যন্ত রয়েছে। ফলে শিক্ষক বদলির মাধ্যমে যেখানে ঘাটতি রয়েছে, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক পাঠানো সম্ভব হবে।
তবে এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন শিক্ষক সংগঠনগুলি। তাঁদের বক্তব্য, শুধুমাত্র শিক্ষক সংখ্যা বাড়ালেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বা সামগ্রিক উন্নতি নিশ্চিত হবে না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণ ও র‍্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত গুরুত্বপূর্ণ। এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষক সরিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠালে যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষক কমানো হচ্ছে, সেখানেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আবার অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন বা দু’জন শিক্ষক পাঠালেই সামগ্রিক সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁদের আশঙ্কা, এর ফলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স’-এর মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শিক্ষক সংগঠনগুলির দাবি, যে বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগে শিক্ষক কম, সেখানে নতুন করে নিয়োগ করা উচিত। বদলির মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা স্থায়ী সমাধান নয়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ গবেষকদের নিয়ে। গবেষণা চলাকালীন কোনও শিক্ষককে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করা হলে তাঁর অধীনে গবেষণা করা পড়ুয়ারা সমস্যায় পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা গবেষকদের। কারণ একজন গবেষক নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে নির্দিষ্ট সুপারভাইজারের অধীনে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেন। মাঝপথে সেই সুপারভাইজার বদলি হলে গবেষণার ধারাবাহিকতা ও মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রেজিস্ট্রেশন নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে দাবি তাঁদের।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পরিপূর্ণা মজুমদারের বক্তব্য, একজন গবেষক নির্দিষ্ট বিষয়ে নির্দিষ্ট সুপারভাইজারের অধীনে দীর্ঘদিন কাজ করেন। সেই শিক্ষক বদলি হয়ে গেলে গবেষণার মান ও ধারাবাহিকতা— দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি রেজিস্ট্রেশন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর দাবি, আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের যে সমস্ত পড়ুয়া অনেক লড়াই করে উচ্চশিক্ষায় আসেন, এই ধরনের অনিশ্চয়তা তাঁদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ফেলে দিতে পারে।
অধ্যাপক মহালয়া চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংখ্যার তুলনা করা হলেও সেই তুলনায় পড়ুয়ার সংখ্যা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষক সংখ্যা তুলনা করলে হবে না ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যাও দেখতে হবে।ফলে শিক্ষক ও গবেষকদের মূল দাবি, অবিলম্বে এই অগণতান্ত্রিক বিধি বাতিল করতে হবে। এছাড়া ,যেখানে শিক্ষক ঘাটতি রয়েছে সেখানে বদলির পরিবর্তে নতুন নিয়োগ করা হোক। রাজ্যের সকল সরকার ঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামোর উন্নতিতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। উপাচার্যহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অবিলম্বে উপাচার্য নিয়োগ করতে হবে। এবং তুলনামূলকভাবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বিদ্যায়তনিক ও পরিকাঠামোগত উন্নতির জন্য নতুন শিক্ষক শিক্ষা কর্মীর পথ সহ সরকারের বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে।
তাঁদের আশঙ্কা, তড়িঘড়ি বদলির ব্যবস্থা কার্যকর হলে শুধু প্রশাসনিক কাঠামো নয়, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার উপরও তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

তাদের বক্তব্য বিগত সরকার ২০১৭ সালে রাজ্যে কলেজ শিক্ষক এবং শিক্ষা কর্মীদের নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ নিয়ন্ত্রণ ও প্রবিধান আইন প্রণয়ন করেছিল ।আদালতের তরফে এই আইনের উপর হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল। তারা ভেবেছিলেন নবনির্বাচিত সরকার অগণতান্ত্রিক আইন প্রত্যাহার করে নেবেন। নতুন নতুন সরকার কোন পদক্ষেপ না করে আইনকে পরিবর্তিত রূপে প্রয়োগ করেছে। তবে তারাও থেমে থাকবেন না, এই আইন কার্যকর না হওয়ার দাবি নিয়ে সামনের সপ্তাহেই যৌথভাবে একটি ডেপুটেশন সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে আচার্য হিসেবে রাজ্যপালকে দেবেন। পরবর্তীতে একটি সিগনেচার ক্যাম্পেইন সমস্ত বুদ্ধিজীবী শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটি কনভেনশন করবেন। পাশাপাশি আইনি লড়াইও জারি থাকবে বলে জানান।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*