তপন মল্লিক চৌধুরী
এই মুহুর্তে দেশের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র হচ্ছে বিহার। আগামীকাল সে রাজ্যে প্রথম দফায় ভোট; মোট ২৪৩টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১২১টি আসনে মতদান হবে বৃহস্পতিবার। অতএব সময় যত ঘনাচ্ছে, উত্তাপ ততই বাড়ছে। এই মহারণে কারা হবে জয়ী? উত্তর মিলবে ১৪ নভেম্বর। কিন্তু আগে থেকেই অঙ্ক কষা শুরু হয়েছে। যদিও ভোটের ফলাফলের পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন বিশেষ করে সেী ভোট যখন বিহার রাজ্যের, তখন তা আরও কঠিন। কারণ দেশের এই রাজ্যটির রাজনীতি থেকে রাজনৈতিক দল, নেতা, জোট, বিরোধিতা এমনকি ভোটের সমাজবিন্যাসকে সাধারণ রসায়নে মেলানো যায় না।। কারণ প্রত্যেকটি ভোটের সময়েই এখানকার ভোট-রাজনীতি এমন একটি রাজনীতির পরীক্ষাগার হয়ে ওঠে যেখানে এই মুহুর্তে যে সমীকরণ তৈরি হয় পরমুহুর্তেই তা ভেঙে যায়। তা স্বত্বেও বিহারের এবারের বিধানসভা ভোট কেবল সে রাজ্যের রাজনীতির জন্যই নয়, গোটা দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশেষঙ্গেরা বলেন বিহার উত্তর ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক কৌশলগত রাজ্য, যার ৪০টি লোকসভা আসন দিল্লির ক্ষমতার অঙ্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কেবল তাই নয়, বিহারে রাজনৈতিক হাওয়া যে দিকে বয়, তার প্রতিধ্বনি শোনা যায় রাজধানীতেও।
রাজনৈতিক বিশেষঙ্গেরা এবারের বিহার ভোট নিয়ে জানিয়েছেন যে, ভোটের ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করবে তরুণ ভোটে। বিহারে ১৮-৩০ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা এবার প্রায় ৩ কোটি। এঁদের একটি বিরাট অংশই এবার প্রথমবার ভোট দেবেন। সমীক্ষা জানিয়েছে, এদের প্রায় ৪৮ শতাংশ এনডিএ-র পক্ষে, ইন্ডিয়া জোটের পক্ষে ৪৩ শতাংশ, বাকি শতাংশ অন্যান্য। যদি এই হিসাব সঠিক হয় তাহলে বিহারে সরকার গঠনে তরুণরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। রাজনৈতিক বিশেষঙ্গদের পাশাপাশি বহু রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বদের মনোভাবও একই রকম, তারা মনে করেন, নতুন ভোটাররাই বিহারের এবারের ভোট ব্যাঙ্কে গুরুত্বপূর্ণ রদবদল ঘটিয়ে দিতে পারে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানিয়েছেন, বিহারে ১৮-১৯ বছর বয়সি ১৪.১ লক্ষ ভোটার এবারের বিধানসভায় প্রথমবার ভোট দেবেন। মোট ২৪৩টি বিধানসভা আসনে এ বার প্রথম ভোট দেবেন ১৪.০১ লক্ষ তরুণ-তরুণী। এবং প্রতিটি আসনে গড়ে ৫ হাজার ৭৬৫ জন প্রথম ভোট দেবেন। এর আগে ২০২০ সালে প্রথম ভোটারের সংখ্যা ছিল ১১.১৭ লক্ষ। হিসাব অনুযায়ী বিহারে এবার নতুন ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে যথেষ্ট। কিন্তু সংখ্যাটা ২০১৫ সালের তুলনায় অনেকটা কম। তা স্বত্বেও ভোট বিশ্লেষকেরা জানাচ্ছেন, দেখা গিয়েছে বিহারে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমশই বাড়ছে পাশাপাশি জয়ের ব্যবধান কিন্তু কমছে, তাই ১৪.১ লক্ষ নতুন ভোটার যে সিদ্ধান্ত নেবে তা ভোটের ফলাফলে বেশ খানিকটা প্রভাব ফেলতে পারে। যে কারণে তরুণ ভোটারদের সমর্থন আদায় করতে রাজনৈতিক দলগুলি এবার খুবই তৎপর এবং তাদের ভোট পাওয়াটা এবারের ভোটে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বিহারের এবারের ভোটে তরুণ বা প্রথম ভোটারদের ভূমিকা নিয়ে একেবারেই অন্যমত না রেখে বরং প্রায় এক সুরেই জানিয়েছেন তরুণদের হাতেই রয়েছে বিহার বিধানসভার চাবিকাঠি। অন্যদিকে একথাও বলতে হবে যে, বিহারের ১৮ থেকে ২৫ দের কাছে এ বারের ভোটের স্বাদও অন্যরকম। গত দশ বছরে বিহার অনেকটাই বদলেছে, বিশেষ করে বিহারের নতুন প্রজন্ম। এই প্রজন্ম আগের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষায় আগ্রহী, তারা উচ্চশিক্ষা চায়, তাদের রাজ্যে আরও বেশি কর্মসংস্থান, শিল্প ও আইটি-হাব তৈরি হোক, মণ্ডল-মন্দির-মুসলিম-দলিতের অঙ্ক নয়, সুশিক্ষা, কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্বচ্ছতা, দুর্নীতি-হীন রাজ্য চায় ১৮-৩০ বছর বয়সিরা। শৈশব থেকে যারা কেবল জাতপাতের রাজনীতি দেখে বেড়ে উঠেছেন। তারা বুঝেছেন বিহারের জন্য কেউই কাজের কাজ কিছু করেনি। তাই তারা রাজ্যের মসনদে এমন একটি সরকার আসুক যে বিহারকে আর্থিক ও সামাজিক ভাবে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম।’ যাদের রাজনীতি ধর্ম-জাতির বেড়াজাল ভেঙে রাজ্যে শিল্প-ব্যবসা-কাজের সংস্থান ইত্যাদিতে মনযোগী হবে। বিহারের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত তরুণেরাও আজ দেশের নীতি, সংবিধান, সংরক্ষণ, ফেডারালিজম, জব ক্রাইসিস নিয়ে তর্কে মসগুল। রিল-তৈরি রাজনৈতিক কনটেন্ট শেয়ার হচ্ছে দেদার। গ্রামাঞ্চলের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাডমিন-চালিত ন্যারেটিভ অনেক বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে তরুণ ভোটারদের কাছে, যা বিহারের রাজনৈতিক যুদ্ধে বিরল। অতএব তরুণদের আস্থা অর্জন করা থেকে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারবে যে তারাই পাবে ১৮-৩০ বছর বয়সীদের ভোট, যে ভোট নিশ্চিত করবে এবার বিহারের কুর্শিতে বসবে কারা।
পরিসংখ্যান দেখলে আরও স্পষ্ট বোঝা যায়- ২০১৫ সালের ভোটের ফলাফল দেখাচ্ছে ৪১টি আসনে জয়ের ব্যবধান এই বছরে প্রথমবার ভোটদাতাদের গড় সংখ্যার (৫ হাজার ৭৬৫) নীচে। সেবার প্রথম দেওয়া ভোটরদের গড় সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৯৭ট। সেই সময়ে ৪৯টি আসনে এই গড় সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। এই ৪৯টি আসনের মধ্যে জেডি(ইউ) এবং আরজেডি উভয়ই ১৩টি করে আসন জিতেছিল। এছাড়া কংগ্রেস ৯টি, বিজেপি ৮টি এবং অন্যান্য দল ৬টি আসন পেয়েছিল। অন্য দিকে, ২০১৫ সালে নতুন ভোটারের সংখ্যা ছিল ২৪.১৩ লক্ষ। সেবার প্রথম ভোটরদের গড় সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৯৩০। সেই সময়ে ৭৩টি আসনে এই গড় সংখ্যাটি জয়ের ব্যবধানের চেয়ে অনেকটাই বেশি ছিল। সেবার ৭৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছিল ৩০টি। জেডি(ইউ) ১৬টি, আরজেডি ১৩টি, কংগ্রেস ৯টি এবং অন্যান্য দল ৫টি আসনে জয়লাভ করেছিল।

Be the first to comment