কৃষ্ণনগর রায়বাড়ির লক্ষ্মী পুজো : তিন শতাব্দীর ঐতিহ্যে ভক্তি, রীতি ও রাজকীয় আভিজাত্যের মেলবন্ধন

Spread the love

রমিত সরকার, নদীয়া :

নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর—যে শহরের প্রতিটি ইটে যেন জড়িয়ে আছে রাজপরিবারের গৌরবময় অতীত। এখানকার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধর্মীয় সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য আর আচার-অনুষ্ঠানের এক সোনালি যুগ। তাঁরই উত্তরসূরিদের শ্বশুরবাড়ি, কৃষ্ণনগরের রায়বাড়িতে আজও টিকে আছে সেই ঐতিহ্যের এক অনন্য অধ্যায়—বছরে চারবার অনুষ্ঠিত লক্ষ্মী পুজো, যার সূচনা প্রায় তিন শতাধিক বছর আগে।চার পূর্ণিমা, এক দেবী, এক ইতিহাস

রায়বাড়ির এই লক্ষ্মী পুজো হয় চারটি পূর্ণিমায়—পৌষ, চৈত্র, ভাদ্র এবং কোজাগরী। প্রথম তিনটি পুজো হয় ঘরের অন্তঃপুরে, কিন্তু কোজাগরীর পূর্ণিমায় ঠাকুরদালান আলোয় ঝলমল করে ওঠে। এই দিনেই হয় প্রধান উৎসব—কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো। একসময় এই পুজোয় সাদা পাঠার বলি দেওয়া হতো, শাক্ত মতে সেই ছিল দেবীর প্রতি পরম ভক্তির নিদর্শন। আজও সেই বিশ্বাস অটুট, যদিও বলির প্রথা বদলে গেছে—এখন হয় চালকুমড়ো বলি।

এই পুজোর সূচনা হয়েছিল মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বৌমা রানি ভবানী দেবীর আমলে। তিনিই প্রথম এই পুজোয় রাজকীয় ধারা ও শাক্ত রীতির সংমিশ্রণ ঘটান। সেই ধারাই আজও রয়ে গেছে অবিকৃত, শুধু আচার নয়—এ যেন পারিবারিক বন্ধন ও ঐতিহ্যের প্রতীক।

রায় পরিবারের এক বিশেষ প্রথা হলো—লক্ষ্মী পুজোর সংকল্প নেওয়া হয় বাড়ির বউদের নামে। পরিবারের পুরুষেরা নতুন ধানভরা বেতের কাটা মাথায় করে মায়ের আসনে ধান বসিয়ে আহ্বান করেন দেবীকে। সেই ধানই বছরের সব চার পুজোয় ব্যবহৃত হয়। গৃহবধূ পত্রিকা রায় জানালেন,“নবান্নের ধান ওঠার পর পৌষ মাসে সেই নতুন ধান দিয়ে প্রথম পুজো হয়। তারপর আর ধান পাল্টানো হয় না—সেই ধানেই বাকি তিন পুজো সম্পন্ন হয়।”

পুজোর দিন ঘরে তৈরি পিঠে, খিচুড়ি, পায়েস, নাড়ু, মোয়া, আর কোজাগরীর রাতে ভাজাভুজি, খই, চিড়ে আর জিলিপির গন্ধে ভরে ওঠে ঠাকুরদালান।

পুজো শেষে হয় এক পুরনো রীতি—কড়ি খেলা। মায়ের ধামায় থাকে খই আর কড়ি মেশানো। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য মন্দিরে সেই কড়ি ছড়িয়ে দেন চারদিকে। যাঁর হাতে পড়ে, তিনি মনে করা হয় সৌভাগ্যবান। দেবীর চারপাশ সাজানো থাকে কলাপাতায়—মায়ের শ্রীবৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে।

পরিবারের সদস্য ওঙ্কার রায় জানান,  “আমাদের পুজো শাক্ত মতে হয়। আগে সাদা পাঠার বলি হতো, এখন হয় চালকুমড়ো। তাই আমিষ-নিরামিষের ভেদ থাকে না। মাকে পাথরের বাটিতে নারকেলের জল নিবেদন করা হয়, সেই জল চোখে ছুঁয়ে নেওয়া হয় আশীর্বাদ হিসেবে।”

পুজোর অন্তিম পর্বে অনুষ্ঠিত হয় হোমযজ্ঞ, যার ধোঁয়া ও মন্ত্রধ্বনিতে ভরে ওঠে রায়বাড়ির আঙিনা।

রায়বাড়ির লক্ষ্মী পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এ এক ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। এখানে ভক্তি, পারিবারিক সংহতি, রীতি ও রাজকীয় গৌরব মিশে গেছে এক স্রোতে। তিন শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এই পুজো আজও মনে করিয়ে দেয়, কৃষ্ণনগরের রাজপরিবার শুধু রাজ্য শাসনে নয়, বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে রেখেছে তাদের ছাপ।

এই পুজো তাই শুধু পূজা নয়—এক জীবন্ত ইতিহাস, যা নদিয়ার আকাশে প্রতি কোজাগরী পূর্ণিমায় আবারও জ্বেলে তোলে ভক্তির দীপ।

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*