আজ আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি এই একটি বাক্য বলতে আমার প্রায় ১৯ বছর লেগে গেছে। নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময়ের নয় প্রতিটি বছর বন্ধ দরজা, প্রতিটি মাস অপেক্ষা প্রতিদিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখ। আজ দীর্ঘ বছর পর কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, আমি শুধু একটি শহরে ফিরে আসিনি আমার হারিয়ে যাওয়া একটি অধ্যায়ের কাছে ফিরে এসেছি।
লেখকের জীবনকে রক্ষা করা শুধু একজন মানুষকে রক্ষা করা নয়, তার কথা বলার অধিকার ভিন্ন মত প্রকাশ প্রকাশ করার অধিকার এবং কলমের স্বাধীনতাকে রক্ষা করার অধিকার। আমি এমন একটা দিনের স্বপ্ন দেখি যেখানে লেখক কে আর পুলিশের পাহারায় চলতে হবে না, কোন মুক্তচিন্তা কে সত্য উচ্চারণের অপরাধে দেশ ত্যাগ করতে হবে না। আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্য সরকারকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

আমি কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে এখানে কথা বলতে আসিনি, আবার কোন দলকে পরাজিত করতে আসিনি আমি এসেছি নারী অধিকার ধর্মনিরপেক্ষতা যুক্তিবাদ মুক্ত চিন্তা বাক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতে। আজকের দিনটি সাক্ষ্য দিচ্ছে ভয় চিরস্থায়ী নয়, অন্ধ দরজা চিরকাল বন্ধ থাকে না।

আজ পয়লা আগস্ট আমার জন্মের মাস আগস্ট আমার নির্বাসনের মাস আগস্ট আজ থেকে আমার প্রত্যাবর্তনের মাস। ১৯৯৪ সালে ৮ই আগস্ট আমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল, বাধ্য করেছিল তখনকার সরকার। রাতের অন্ধকারে আমার স্বদেশের দরজা আমার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তারপর একের পর এক সরকার এসেছে সেই দরজা আর খোলেনি, আর সাত দিন পর আমার নির্বাসনের ৩২ বছর পূর্ণ হবে যা আমার । স্বদেশের বাইরে কাটানোর সময় এরই মধ্যে স্বদেশে কাটানোর সময় কে অতিক্রম করেছে। রাষ্ট্র আমাকে দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছে কিন্তু দেশকে আমার মনের ভেতর থেকে সরাতে পারেনি। একজন লেখক এর জন্য দুই বাংলায় কোথাও একটা ছোট ঘর মিলল না। ইউরোপ আমাকে নাগরিকত্ব নিরাপত্তা আশ্রয় দিয়েছেন তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ, নাগরিকত্ব আপনত্ব এক জিনিস নয়।

বাংলা কি কোনদিন এপার ওপার বলে ভাগ করিনি। কাঁটাতার ভূখণ্ডকে ভাগ করতে পারে, ভাষাকে ভাগ করতে পারে না। আমার নির্বাসন নিছক কোন একটি দুর্ঘটনা নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতার ইতিহাস। রাষ্ট্র যখন নাগরিক অধিকার রক্ষার বদলে, ধর্মীয় হুমকির কাছে নতি স্বীকার করে, তখন শুধু একজন লেখক নির্বাসিত হন না আইনের শাসক নির্বাসিত হন, মেয়ে নির্বাসিত হয় রাষ্ট্রের নৈতিক শাসন নির্বাসিত হয়।
একটি সভ্য সমাজে একটি যুক্তির ওপর আরেকটি যুক্তি, একটি বইয়ের উত্তরে আরেকটি বই কোন মত অপছন্দ হলে প্রতিবাদ করুন পাল্টা লিখুন কিন্তু একজন লেখক কে নির্বাসিত করবেন না তার দেশ পাঠক থেকে তাকে নির্বাসিত করবেন না, আমার দেশ বাংলাদেশ আমাকে শাস্তি দিয়েছিল। “আমি কি কাউকে হত্যা করেছিলাম? সারা দেশে আমাকে হত্যার জন্য মিছিল বের হল। রাষ্ট্র আমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করল, আমাকে বের করে দিল। আমার নির্বাসন কোনও ব্যক্তিগত বিষয় নয়। আইনের শাসনের নির্বাসন।”
আমি কোন মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করি না আমি লড়াই করি অশুভ মতাদর্শের বিরুদ্ধে। সেইসব মতাদর্শের বিরুদ্ধে যেগুলি নারীকে পুরুষের অধীন করে, শিশুকে যুক্তির বদলে অন্ধ আনুগত্য শেখায় , ধর্মত্যাগ ও ঈশ্বর ও অবিশ্বাসকে অপরাধ বলে , ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন মতের মানুষকে ঘৃণা করতে বা হত্যা করতে শেখায়।
আমি মৌলবাদীর বিরোধী। আমি ইসলামী মৌলবাদীর বিরোধী কারণ সব থেকে একে খুব কাছ থেকে দেখেছি। নারীর উপর অত্যাচার দেখেছি অ মুসলিমের ওপর নিপীড়ন দেখেছি। মানুষের ব্যক্তিগত চিন্তা স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে দেখেছি। সারা দেশ জুড়ে জিহাদি উগ্রপন্থীদের সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ড দেখেছি।
ইসলামের সমালোচনা মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ নয়। বরং মুসলিম সমাজের বিবর্তনের জন্য এই আলোচনা অত্যন্ত জরুরী।মানুষের অধিকার আছে কিন্তু মতাদর্শের অধিকার নেই। কে রক্ষা করতে হবে, মতাদর্শকে প্রশ্ন করতে হবে। আমি চাই মুসলিম সমাজে মুক্ত চিন্তার চর্চা বারুক। যুক্তিবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের সংখ্যা বাড়ুক। নারীরা পূর্ণ সমানাধিকার পাঠ কারণ অধিকার লঙ্ঘিত না হোক। আজকের বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক সমাজে খ্রিস্টধর্ম হিন্দু ধর্ম ইহুদি ধর্ম বৌদ্ধ ধর্ম কোন ধর্ম নীতিগতভাবে সমালোচনার উর্ধ্বে নয়, ধর্মের সমালোচনা করে এই বহু সমাজ বৈষম্যের বিষয় থেকে বেরিয়ে এসেছে। মুসলিম সমাজ অন্ধ আনুগত্যের সীমা ভেঙে মানবাধিকারের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যান। আমরা সমালোচনা করি ধ্বংস করার জন্য নয় পরিবর্তনের জন্য।
আরেকটি বেদনাদায়ক বিষয় হচ্ছে শুধু মুসলমান সমাজকে অন্ধকারে রাখতে শুধু ইসলামী উগ্রপন্থীরাই সক্রিয় নয়, তথাকথিত প্রগতিশীল ও বামপন্থীদের একটি অংশ দায়ী। নিজেরা বাক স্বাধীনতা ও নারী পুরুষের সমান অধিকারের কথা বললেও, ইসলামের সমালোচক সংস্কারকদের তারা মুসলমান বিদ্বেষী আখ্যা দেন। আমি অহরহ তাদের আক্রমণের শিকার হই।, তাদের অভিযোগ আমি কেন খ্রিস্টান বৌদ্ধ , হিন্দুদের বিরুদ্ধে একসাথে যুদ্ধ করছি না, তারা কি একই যুক্তিতে রাজা রামমোহন রায় কে এই বলে বাতিল করেন, কেন তিনি সতীদাহের বিরুদ্ধে লড়েছেন পৃথিবীর অন্যন্য ধর্মের সংস্কারের বিরুদ্ধে লরেননি কেন।
যারা নিজের নিজেদের জন্য আধুনিকতা চান কিন্তু মুসলমান সমাজের জন্য চান মধ্যযুগীয় বিধান তারা মুসলমান সমাজের সবচেয়ে বড় শত্রু । যারা নিজেদের মেয়েদের স্বাধীনতাকে অধিকার বলেন কিন্তু মুসলিম মেয়ের পরাধীনতা কে সংস্কৃতি বলে তারা মোটেও প্রগতিশীল নন। বাংলাদেশের মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিস্তার ভয়াবহ।
ভারত ও বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিচয় এর উর্ধ্বে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি দরকার তবে তা সংখ্যাগুরু ধর্মেরবিধান নয়, সংবিধান মানবাধিকার এবং নারী পুরুষের পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে রচিত হবে, আমি এমন এক উপমহাদেশের স্বপ্ন দেখে যেখানে ধর্মান্ধতার বদলে থাকবে বিজ্ঞানমনস্কতা, অজ্ঞতার বদলে শিক্ষা, পশ্চাৎ পদতার বদলে আধুনিকতা।
আমার কলকাতায় ফেরা শুধু আমার ব্যক্তিগত আনন্দ নয়, এটি নির্বাসন এবং নিষেধাজ্ঞার প্রতি বাক স্বাধীনতা মুক্তচিন্তা এবং মানুষের ভালবাসার জয়।। নির্বাসন আমার ঠিকানা কেড়ে নিয়েছে কিন্তু আমার ভাষা কেড়ে নিতে পারেনি। আমার ঘর কেড়ে নিয়েছে কিন্তু আমার ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা কেড়ে নিতে পারেনি। পয়লা আগস্ট শুধু একটি মাত্র অনুষ্ঠানের দিন না এটা একটি বন্ধ দরজা খোলার দিন।
ইতিহাস যেমন মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল, ইতিহাস তেমনই মনে রাখে কারা দরজা খুলেছিল।
আজ আমি বলতে পারি শেষ পর্যন্ত কোন মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ।
(রবীন্দ্র সদনে এক আবেগঘন সন্ধ্যায় বক্তা তসলিমা নাসরিন।অনুলিখন: বিউটি চাঁদ)

Be the first to comment