তপন মল্লিক চৌধুরী :
বিহার ভোটের প্রথম দফার মাত্র দু’সপ্তাহ আগেই মহাজোট বন্ধনের ঐক্যে লাগলো বড়সড় ধাক্কা। আসন সমঝোতার বদলে আকচাআকচি থেকে শুরু করে দল ত্যাগের মতো ঘটনায় মহাজোট যে প্রায় ভাঙনের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে সেকথা বলাই যায়। যদিও পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্যতম শরিক দল আরজেডি আর কংগ্রেস কোমড় বেঁধে নেমে পড়েছে কিন্তু জোটের ভেতরেই ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে একাধিক আসনে দুই দলের প্রার্থীরা মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামায়। একদিকে দেখা যাচ্ছে অন্তত ১২টি আসনে কংগ্রেস, আরজেডি, সিপিআই ও বিকাশশীল ইনসান পার্টি (ভিআইপি)-র মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে, রাজনৈতিক মহল যাকে বিহার নির্বাচনে বিরোধী জোটের ঐক্যের প্রশ্নে বড়সড় ধাক্কা বলেই মনে করছেন। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, আরজেডি এবং কংগ্রেস সরাসরি বৈশালি, সিকান্দরা, কাহালগাঁও, সুলতানগঞ্জ, নরকাটিয়াগঞ্জ ও ওয়ারসালিগঞ্জ- এই ছটি আসনে মুখোমুখি। একইভাবে বচ্ছোয়ারা, রাজাপাকর, বিহার শরিফ ও করঘর- এই চারটি আসনে সিপিআই এবং কংগ্রেস পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রার্থী দিয়েছে, সেইসঙ্গে চেইনপুর ও বাবুবারহি আসনে লড়াই করছে ভিআইপি ও আরজেডি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিহারে বিরোধীরা যদি একজোট হয়ে ভোটে লড়তো তাহলে এনডিএ-র পক্ষে জয় মোটেও সহজ হত না, বরং তারা কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হত। কিন্তু এইভাবে বিরোধী ভোট বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় লড়াইয়ের পরিস্থিতি শাসকজোটের জন্য অনেকটাই সহজ হয়ে যাচ্ছে।
বিহার ভোটে বিরোধী জোটের পক্ষে যখন আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি তখন থেকেই বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র মধ্যে অন্তর্কলহ শুরু হয়েছিল যা শাসক দলের বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়াইয়ের আগে প্রবল টানাপোড়েনের সৃষ্টি করে। অর্থাৎ ভোটের মূল লড়াইতে নামার আগেই জোটসঙ্গী দলগুলির মধ্যে মতভেদ প্রকাশ্যে এসে পড়ে। এর অব্যবহিত পরেই একদিকে কংগ্রেস যেমন একের পর এক আসনে প্রার্থী ঘোষণা করতে শুরু করে, অন্যদিকে তেজস্বী যাদবের দল আরজেডিও তাদের প্রার্থীতালিকা ঘোষণা করে দেয়। এবং দেখা যায় সেই তালিকায় রয়েছে এমন কয়েকটি আসন, যেখানে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়াচ্ছেন জোটসঙ্গী কংগ্রেসের প্রার্থীরাই। উল্লেখ্য, গত সোমবার যখন আরজেডি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪৩টি বিধানসভা আসনের প্রার্থীতালিকা প্রকাশ করে, তাদের সেই তালিকা প্রকাশ হওয়া মাত্র রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়— তাহলে কি বিহার নির্বাচনে মহাজোটবন্ধনে মহাজটবন্ধন শুরু হল? কেবল তাই নয়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও একথাও বলছেন যে, মহাগঠবন্ধনের এই আসন সমঝোতা না হওয়ার দ্বন্দ্ব সরাসরি বিজেপি এবং এনডিএ-কেই বাড়তি সুবিধা দেবে।

মহাজোটের এই পরিস্থিতিতে আচমকা বিহার নির্বাচন থেকেই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে হেমন্তের দল ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা। জেএমএম এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসাবে কংগ্রেস এবং আরজেডি-র বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের’অভিযোগ তুলেছে। ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা এর যোগ্য জবাব দেওয়া হবে বলেও তোপ দেগেছে। জেএমএম নেতা সুদিব্য কুমার এ প্রসঙ্গে জানান, ‘আগের বার বিহার বিধানসভা নির্বাচনে আরজেডি এবং কংগ্রেস জেএমএমকে তিনটি আসন দেবে বলেও পরে সেই কথা রাখেনি।তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছিল। জেএমএম গত বছর ঝাড়খণ্ড বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস, আরজেডি এবং বামেদের জন্য একটি বড় সংখ্যক আসন ছেড়ে দিয়েছিল। চলতি বছর ফের বিহার ভোটে জেএমএমকে অপমানিত করা হল। জেমএম এর কড়া এবং যোগ্য জবাব দেবে’। বিহারের বিধানসভা ভোট এগিয়ে আসায় সে রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে যেমন তেমনি ঘর গুছিয়ে নিচ্ছে এনডিএ জোট কিন্তু ইন্ডিয়া জোট? তারা আক্ষরিক অর্থেই ছন্নছাড়া। বিহার বিধানসভা ভোটের প্রথম থেকেই ঠিক ছিল ইন্ডিয়া জোটের হয়েই জেএমএম লড়াই করবে। কিন্তু আসন সমঝোতা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তীব্র বিরোধ শুরু হলে আচমকাই হেমন্তর দল ঘোষণা করে, বিহারের ৬টি আসনে তারা একক ভাবে লড়বে। কিন্তু তার পরে ২৪ ঘণ্টা না পেরতেই বিধানসভা ভোট থেকে কার্যত হেমন্ত-র দল নাম তুলে নিল।
জেমএম-এর এই ভাবে ইউ টার্ন করায় বিহারের ভোট নিয়ে বিশেষ করে মহাজোটবন্ধন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারও মত, এটা খুব স্পষ্ট যে লালুপ্রসাদ যাদবের আরজেডি এবং কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের পুরোনো শরিক হেমন্তর টানাপড়েন চলছে। বিহার ভোটে না লড়ার কারণ হিসেবে এই দুটি দলকে কাঠগড়ায় তুলেছে জেএমএম-ও। জেএমএম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চক্রান্ত হয়েছে। পাশাপাশি এই পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন কিন্তু উঠছে যে ঝাড়খণ্ডে কংগ্রেস এবং আরজেডির সঙ্গে জোট করেই হেমন্ত সোরেন সরকার চালাচ্ছেন, বিহারে জোট ভেঙে বেরিয়ে এসে হেমন্ত ঝাড়খণ্ডের ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেবেন? ইতিমধ্যে জেমমএম-এর তরফে জানানো হয়েছে, ঝাড়খণ্ডে কংগ্রেস এবং আরজেডির সঙ্গে তারা আর জোটে থাকবে কি না, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। কংগ্রেস এবং আরজেডিকে তারা এই অপমানের যোগ্য জবাব দেওয়ার কথা তারা যেমন জানাচ্ছে পাশাপাশি বিহারে তারা কোনো দলকেই আর সমর্থন করবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ বিহার ভোটে মহাগঠবন্ধনকে এর ফল ভোগ করতে হবে।

Be the first to comment