জিনপিং-পুতিন-মোদী কী বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মোড় আনতে চলেছেন

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী ।।

গত বছর (২০২৪) এসসিও বা সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন বলেছিলেন, ‘যাদের লক্ষ্য এক; কোনো পাহাড় বা সমুদ্র তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে পারে না’ তখন ওই বক্তব্যকে বাড়াবাড়ি বলে মনে হয়েছিল কারণ, তখন তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই বলে মনে হয়েছিল। সেবার এসসিও সম্মেলন শুরুর আগে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছিলেন, তিনি সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না। জোটের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওইভাবে সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার ঘোষণা বেইজিং ও মস্কো নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতি ভারতের প্রকাশ্য উপেক্ষার সামিল ছিল। কিন্তু এক বছর পর, চীন আয়োজিত এসসিও সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সবচেয়ে বেশিসংখ্যক নেতা। কারণ আজ বিশ্বের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গিয়েছে। প্রথমত, ভারতীয় পণ্যের ওপর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ থাকা স্বত্বেও নয়াদিল্লিকে বেইজিংয়ের আরও কাছাকাছি নিয়ে যেতে এবং সম্পর্ক জোরদার করতে বাধ্য করেছে। ইউরেশিয়ার অন্য প্রভাবশালী দেশগুলির সঙ্গেও ভারত সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট। ট্রাম্পের নয়া শুল্ক আরোপে দুনিয়াজুড়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, অনেক দেশকে তা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা, হয়ত এখান থেকে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলি একত্রিত হয়ে পশ্চিমী বিশ্ব, বিশেষত আমেরিকার সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় সক্ষম হয়ে উঠবে।

দুই পুরনো বন্ধু রাশিয়া ও চীন-তো আমেরিকার দুনিয়াজুড়ে যে অর্থনৈতিক ও সামরিক বলয় সেখান থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতেই একত্রিত হয়েছে। আমেরিকার প্রভাব মুক্ত হয়ে চীন-রাশিয়ার সঙ্গে মিলে ভারতের ক্ষেত্রে ত্রিশক্তি হওয়ার সমস্যা ছিল ভারত ও চীনের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক। কিন্তু সেই পাশার ঘুটিও প্রায় উল্টে দিয়ে এশিয়ার এই দুই শক্তির দীর্ঘদিনের শত্রুতা ঘুচিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমেরিকার শুল্ক নীতির কড়া পদক্ষেপে যখন প্রায় গোটা দুনিয়া ট্রাম্পের কাছে নত তখন নিজেদের কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে চীন ও ভারত। ট্রাম্পের কোনো রকম চাপ ও হুমকিকে গুরুত্ব না দিয়ে এসসিও-তে একজোট হয়েছে বিশ্বের অন্যতম তিন মহাশক্তি রাশিয়া-চীন ও ভারত। আমেরিকার বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক হুমকিকে বেপাত্তা করে এই ত্রিশক্তি কৌশলগত যে অবস্থান নিয়েছে তা কী বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারবে? সম্মেলনে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি কৌশলগত অংশীদারিত্বের বার্তাও দিয়েছেন রাষ্ট্রপ্রধানরা। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-রাশিয়া-চীনের কাছাকাছি হওয়ার কারণে সমস্যায় পড়তে পারেন ট্রাম্প। ইতিমধ্যে ভারত জানিয়ে দিয়েছে, রাশিয়া থেকে গ্যাস কেনা হবে কিন্তু আমেরিকার মিলিটারি সরঞ্জাম কেনা নাও হতে পারে। ফলে আমেরিকা থেকে এফ-৩৭ জেট কেনার যে প্রতিশ্রুতি ভারত দিয়েছিল তা আর বাস্তবায়িত হচ্ছে না। অন্যদিকে রাশিয়া জানিয়েছে, আমেরিকার বাজারে ভারতের পণ্য যদি উচ্চ শুল্কের শিকার হয়, তবে ভারতের জন্য রাশিয়া নিজের বাজার খুলে দেবে। কেবল তাই নয়, জানা গিয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত আমেরিকার ডলারের বদলে চীনের মুদ্রা ইউয়ান ব্যবহার করবে। ভারতের এমন সিদ্ধান্ত বিশ্ব-বাণিজ্য ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। যদিও চীন-ভারতের সীমান্ত সমস্যা এখনো সুরাহা হয়নি। তা স্বত্বেও শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক কাছাকাছি হওয়া ভূ-রাজনীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্যকে রীতিমতো যুদ্ধাস্ত্র বানিয়ে ফেলেছেন। তিনি যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করার চেয়ে বাণিজ্য দিয়ে যুদ্ধ করাটাই পথ ভেবেছেন। তাই কোনো দেশের উত্থান ঠেকাতে তিনি বাণিজ্যকে ব্যবহার করছেন, কিন্তু সেটা মুক্তবাণিজ্য ব্যবস্থার পরিপন্থী হওয়ায় আমেরিকা নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে গিয়ে নিজেদের তৈরি মুক্তবাণিজ্য ব্যবস্থাকেই জলাঞ্জলি দিতে বসেছে। ট্রাম্প শুল্ক ও বাণিজ্যনীতিকে কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থে নয়, ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যযুদ্ধ, রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা ও ভারতের ওপর শুল্কসংক্রান্ত চাপকে কার্যত বাণিজ্যকে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু তাঁর এই কৌশল উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। চীনের সঙ্গে রাশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইউক্রেন যুদ্ধের পর আরও উচ্চতায় উঠেছে। একে ট্রাম্পের কূটনীতির ব্যর্থতা বলাই যায়। রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে উঠতে তেল ও গ্যাস বিক্রিতে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়েছে। চীনও রাশিয়াকে সস্তা জ্বালানি, কাঁচামালের উৎস ও কৌশলগত মিত্র মনে করছে; যেখানে একসময় রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক ছিল খারাপ। ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণ তেল আমদানি করছে এবং চীনের সঙ্গে ব্রিকসে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ফলত ভারতের উপর ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর রাশিয়া-ভারত-চীনের সমঝোতাকে সরাসরি আমেরিকার বাণিজ্য-চাপের প্রতিক্রিয়া বলা যেতে পারে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিযোগিতা মূলত সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার দৌড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু একবিংশ শতকের ২০-র দশক থেকেই অর্থনীতি ও প্রযুক্তিই হয়ে ওঠে প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নতুন বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও বাজারে প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন। রাশিয়া-চীন-ভারত জানে তাদের কারও একার পক্ষে এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে তারা যৌথ প্রকল্পে মনোযোগী হয়ে ঊঠেছে। ট্রাম্প যদি শুল্কচাপের নীতিতে অটল থাকেন তাহলে প্রক্রিয়া আরও দূর পর্যন্ত গড়াবে। অর্থাৎ স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর যেমন এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা শুরু হয়েছিল, এখন সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*