তপন মল্লিক চৌধুরী :
যেমন পেট্রোলে মিশছে ইথানল, দুধে ঢালা হছে জল, ভোটার তালিকায় কারচুপি তেমনি কাশির সিরাপেও (Cough Syrup) মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক। বাদ যাচ্ছে না শিশুদের কাশির সিরাপ। সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের ছিন্দওয়াড়া জেলায় ৯ শিশুর মৃত্যুর ঘটেছে। কারণ কাশির সিরাপ খাওয়ানো হয়েছিল ওই শিশুদের। তার জেরেই রাতারাতি কিডনি বিকল হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে রাজস্থানের ভরতপুর ও সিকার এলাকাতেও। তদন্ত জানাচ্ছে, দুটি ক্ষেত্রেই শিশুদের ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই কাফ সিরাপ খাওয়ানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে জম্মুতে বেশ কিছু শিশু অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ায় ওই ঘটনাকে অনেকে রহস্য-রোগ বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু দেখা যায়, যে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল এবং মারা যায় তারা কাশি এবং সর্দিতে ভুগছিল, স্থানীয় ডাক্তাররা তাদের কাশির সিরাপ লিখে দিয়েছিলেন। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে, তাদের কিডনি বিকল হয়ে যায়। তদন্তে জানা যায় যে ডিজিটাল ভিশন নামক একটি ভারতীয় ওষুধ কোম্পানির তৈরি কাশির সিরাপের তিনটি নমুনায় ডাইথিলিন গ্লাইকল বা ডিইজি রয়েছে, যা রঙ, কালি, ব্রেক ফ্লুইড তৈরিতে ব্যবহার করা হয় আর সেই বিষাক্ত অ্যালকোহল খাওয়ার পর কিডনি বিকল হয়। কেবল তাই নয়, ভারতে তৈরি কাশির সিরাপ খেয়ে জাম্বিয়ায় ৬৬ শিশুর এবং একই সিরাপ খেয়ে উজবেকিস্তানেও ১৮ শিশু মারা যায়। ২০২২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হরিয়ানার একটি ওষুধ কোম্পানির কাশির সিরাপ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ভারতে তৈরি কাশির ওষুধ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সতর্কতা জারি হয়।
শিশুদের সুস্থ করার জন্য যে ওষুধ খাওয়ানো হয়, সেটিই যখন সাক্ষাৎ মৃত্যুর কারণ, তখন একটি প্রশ্নই বিরাট আকারে জেগে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? প্রশাসন থেকে আইন-আদালত কোথা তো কোনো উত্তর নেই। ছিন্দওয়াড়া, ভরতপুর, সিকার প্রভৃতি এলাকার শিশুরা যে ট্র্যাজেডির শিকার হল এবং তাদের পরিবারগুলি যে অসহায় অবস্থায় বুক ফাটা কান্নায় ভাসলো তা এটাই প্রমাণ করল যে এদেশে উৎপাদিত ওষুধ এবং তার ব্যবহার কতখানি নিরাপত্তাহীন এবং বিপজ্জনক। এটা সাধারণ মানুষের যত বড় নিরাপত্তাহীনতা বা অসহায়তা দেশের ওষুধ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার নিস্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি জঘন্য। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ওষুধ প্রস্তুতকারক দেশ, যেখানে জেনেরিক, ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ, ভ্যাকসিন এবং উপাদান তৈরির জন্য ১০ হাজারের বেশি ওষুধ কারখানা আছে। কিন্তু সেই দেশে তৈরি ওষুধের মান নিয়ে অনেক সময়েই প্রশ্ন ওঠে। কারণ এ দেশের বহু জায়গাতেই নকল ওষুধ তৈরি হয় এবং তার বেশিরভাগই ছোট শহর এবং গ্রামে বিক্রি হয়। অনেক রাজ্যে রাষ্ট্র পরিচালিত ওষুধ পরীক্ষার ল্যাবগুলিতেও যথেষ্ট পরিকাঠামোর অভাব, কর্মী সংখ্যাও কম এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি ও প্রয়োগও খুব দুর্বল। যে কারণে ২০১৪ সালে, ভারতের শীর্ষ ওষুধ নিয়ন্ত্রক জানিয়েছিলেন, যদি তাঁকে আমেরিকার মান অনুসরণ করতে হত তাহলে তাঁকে প্রায় সমস্ত ওষুধই বন্ধ করতে হয়। এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতকে “বিশ্বের ফার্মেসি” হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
সরকারি রেকর্ড থেকে জানা যায় যে, ২০০৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশের ২৮টি রাজ্য এবং তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের যে ৭,৫০০টির বেশি ওষুধের মান পরীক্ষা হয়েছিল তার কোনোটিকেই “মানসম্মত মানের নয়” বা নিম্নমানের ওষুধ বলা হয়েছিল। কারণ দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের গবেষণায় দেখা যায় ওই ওষুধগুলিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে উপাদান ছিল না। ফল হিসাবে দেখা গেল গত দশকে এই গুণমানের ওষুধ থেকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেল কয়েক লক্ষ। ছিন্দওয়াড়া, ভরতপুর, সিকার প্রভৃতি এলাকার শিশুদের ক্ষেত্রেও দেখা গেল তাদের খাওয়ানো কাশির ওষুধেও ডাইইথিলিন গ্লাইকল, ইথিলিন গ্লাইকল ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ এই উপাদানগুলি অ্যান্টিফ্রিজ, রং, ব্রেক ফ্লুইড এবং প্লাস্টিকে ব্যবহার করা হয়, কোনোভাবেই এই উপাদানগুলি ওষুধ তৈরির জন্য নয়। তাহলে সেগুলি কীভাবে ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়? যে ডাইইথিলিন গ্লাইকল, ইথিলিন গ্লাইকল গিলে ফেললে বিষাক্ত যৌগে ভেঙে যায়, যার ফলে কিডনি, লিভার এবং স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়। সেগুলি কীভাবে শিশুদের কাশির ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হল? ছিন্দওয়াড়া, ভরতপুর ও সিকার এলাকার শিশুদের লক্ষণগুলির মধ্যে ছিল বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা এবং প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, তারপর দ্রুত কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যু। প্রশ্ন কারা সেই উপাদান দিয়ে কাশির সিরাপ তৈরি করলো এবং কিভাবে তা বাজারে বিক্রি হল?

Be the first to comment