ঐতিহ্যের অমল ধারা: কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে আজও সাড়ম্বরে জগদ্ধাত্রী পুজো

Spread the love

নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর:

নদিয়ার কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি আজও ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক। শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোয় সেই একই আচার, সেই একই শোভাযাত্রা, আর সেই চিরচেনা ভক্তির আবহ—সব কিছুই যেন সময়কে থামিয়ে দেয়।

কথিত আছে, ১৮ শতকের মাঝামাঝি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের হাত ধরেই বাংলায় শুরু হয় জগদ্ধাত্রী পুজো। রাজত্বকালে নবাব আলিবর্দি খাঁ তাঁর কাছে বারো লক্ষ টাকা কর দাবি করেন। রাজা তাতে আপত্তি জানালে তাঁকে বন্দি করা হয় মুর্শিদাবাদে। মুক্তি পেয়ে কৃষ্ণনগরে ফেরার পথে তিনি জানতে পারেন, দুর্গাপুজোর বিসর্জন হয়ে গিয়েছে। দেবীর আরাধনায় উপস্থিত থাকতে না পারায় গভীর অনুতাপে ভরে ওঠে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মন।

সেই রাতেই স্বপ্নে মা জগদ্ধাত্রী তাঁকে দর্শন দেন এবং পুজোর নির্দেশ দেন বলে জানা যায়। পরদিন থেকেই শুরু হয় নতুন এক ঐতিহ্যের পথচলা—দুর্গাপুজোর বিকল্প হিসেবে কৃষ্ণনগরে সূচনা হয় জগদ্ধাত্রী পুজোর।

ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে রাজবাড়িতে পুজোর সূচনা হয় ১৭৫৪ সালের দিকে। কেউ কেউ বলেন, ১৭৬২ বা ১৭৬৩—যে বছরই হোক না কেন, তার গুরুত্ব কম নয়। এই পুজোই পরবর্তীকালে বাংলার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি ফরাসডাঙ্গার দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অনুপ্রেরণায় চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন— যা আজ বিশ্ববিখ্যাত।

রাজবাড়ির পুজো আজও রাজকীয় ঐতিহ্যের সব নিদর্শন মেনে চলে। পুজোর সকালে দেবীর ঘট জলঙ্গীর জলে ডুবিয়ে আনতে হয় পালকিতে করে— এই রীতি আজও অপরিবর্তিত। বিসর্জনের দিনও দেবীকে কাঁধে তুলে সাঙে করে রাজবাড়ির সামনেই ঘোরানো হয়, কারণ প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী রাজরানির জন্যই সেই সময়ে দেবীকে এইভাবে দর্শন করানো হত।

যুগ পাল্টেছে, রাজনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ—সবই বদলেছে। কিন্তু কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির আঙিনায় ঢুকলেই বোঝা যায়, ঐতিহ্যের সেই সোনালি সুতো এখনও ছিন্ন হয়নি। প্রতিমা দর্শনে উপচে পড়ে ভক্তের ঢল। রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে বাজে ঢাক, শঙ্খ, উলুধ্বনি, আর ভেসে আসে জলঙ্গীর হাওয়ায় মিশে থাকা ভক্তির গন্ধ।

বিভিন্ন বারোয়ারি পুজো আজ শহরজুড়ে আয়োজন করলেও কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজো রয়ে গেছে ইতিহাসের ধারক ও বাহক হিসেবে। এ শুধু একটি পুজো নয়—এ যেন বাঙালির বিশ্বাস, ঐতিহ্য আর আত্মপরিচয়ের প্রতীক।

রাজবাড়ির এক প্রবীণ সদস্যের কথায়, “সময় অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু মায়ের আরাধনার সেই রাজকীয় মর্যাদা ও ভক্তি আজও অটুট। যতদিন কৃষ্ণনগর আছে, ততদিন রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজো থাকবে ইতিহাসের অমল প্রমাণ হয়ে।”

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*