আজ নীতীশের শপথ, আনন্দের মাঝেও হৃদয়ে যন্ত্রণার কাঁটা প্রয়াত স্ত্রী মঞ্জুর জন্য

Spread the love

পিয়ালী :

কথায় আছে সকল সফল পুরুষের পেছনে একজন নারী থাকেন। সকলের ক্ষেত্রে এটা সত্যি না হলেও বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের ক্ষেত্রে তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি।

আজ পাটনার গান্ধী ময়দান-এ দশম বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নীতীশ কুমারের। আজ বড় মনে পড়ছে তাঁর স্ত্রী মঞ্জু কুমারী সিনহার কথা। রাজনীতির আলোকিত বৃত্ত থেকে দূরে থাকতেন মঞ্জু সিনহা। অত্যন্ত সরল সাধারণ জীবনযাপন করতেন তিনি। তাঁর এই জীবনযাপন নীতীশকে নৈতিক শক্তি যোগাতো। লেখক মুরলী মনোহর শ্রীবাস্তব তাঁর বিকাশপুরুষ বইয়ে নীতীশ কুমারকে নিয়ে লিখতে গিয়ে স্ত্রী মঞ্জু কুমারী সিনহাকে নিয়েও যথেষ্ট আলোকপাত করেছেন।

২৪ শে নভেম্বর ২০০৫, আজকের মতোই সেজে উঠেছিল পাটনার গান্ধী ময়দান। নীতীশের সেদিন মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ। ময়দানে শুধুই কালো মাথার ভিড়। সবাই উচ্ছ্বসিত। তারই মাঝে নীতীশের স্ত্রী মঞ্জু সিনহা তাঁদের একমাত্র ছেলে নিশান্ত ও পরিবারের অন্যদের সঙ্গে বসেছিলেন। মুখে ছিল না অতিমাত্রায় আত্মতৃপ্তির ছাপ, কিন্তু চোখ দিয়ে বেরোচ্ছিল আনন্দাশ্রু। সেদিন তাঁকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেন নীতীশের এই বিজয় এবং মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কি? মঞ্জু বলেন, অসত্যকে ছাপিয়ে সত্যের বিজয়। তিনি আরও বলেন, এই জয় সত্য এবং সাধারণ মানুষ বা আমআদমির জয়।

মঞ্জুর এই বয়ান পরের দিন সমস্ত খবরের কাগজে হেডলাইন হয়। মঞ্জু তখন পাটনার কমলা নেহেরু কন্যা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। তাঁর জীবনযাপনে কোনদিনই বাহুল্য স্পর্শ করতে পারেনি।

সাধারণ একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারকে বিবাহ করেছিলেন তিনি। সেখান থেকে নীতীশ বিধায়ক, সাংসদ রেলমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু মঞ্জু তাঁর জীবনযাপনে আগের মতই ছিলেন। মঞ্জু এবং নীতীশের প্রেম কাহিনি সকলের কাছে দৃষ্টান্ত স্বরূপ।

দৈনিক ভাস্করে মঞ্জু নীতীশের প্রেম কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে তার খানিকটা অংশ পাঠকের জন্য তুলে ধরছি। আপনাদের আশা করি ভালো লাগবে।

১৯৭২-এ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরের বছরই ১৯৭৩-এর ২২ শে ফেব্রুয়ারি মঞ্জু ও নীতীশ কুমারের বিয়ে হয়।

সিরিয়াস রাজনীতিক নীতীশ কুমার ব্যক্তিগত জীবনে খুব রোমান্টিক ছিলেন। স্ত্রীর উদ্দেশ্যে ফিল্মি গান গুনগুন করে গাইতেন তিনি। বিয়ের আগে মঞ্জু কুমারীকে দেখেননি পর্যন্ত। তাই মঞ্জুর কলেজে নিজের বন্ধুদের পাঠান নীতীশ। বুদ্ধিমতী মঞ্জু বুঝতে পেরে যান এরা নীতীশের বন্ধু। তিনি লজ্জা পেয়ে অন্য জায়গায় চলে যান। যাইহোক এরপর বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু বিয়েতে পণ বাবদ ২২ হাজার টাকা তাঁকে দেওয়া হচ্ছে শুনে, নীতীশ বেঁকে বসেন। রাম মনোহর লোহিয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত নীতীশ বারণ করেন পণ দিতে এবং তা মেনে নেওয়া হয়। এরপর নীতীশ বলেন, মঞ্জুর এই বিয়েতে মত আছে কিনা দেখুন। মঞ্জুর মঞ্জুরির পর নীতীশ-মঞ্জুর বিয়ে ঠিক হয়। আগে যে কার্ড বানানো হয়েছিল তা বাতিল করে নতুন করে কার্ড তৈরি হয়। সেই নতুন বিয়ের কার্ডে লেখা হয় তিলক, দহেজ বা পণপ্রথা এবং শোষণমুক্ত কু-প্রথা থেকে মুক্ত এবং পুষ্প মালা ও আশীর্বাদ ছাড়া কোন প্রকার উপহারের লেনদেন হবে না।

নীতীশ চাইতেন, মঞ্জু বিয়ের পরে পড়াশোনা জারি রাখুক। তাই বখতিয়ারপুরের শ্বশুরবাড়িতে কিছুদিন থাকার পর পাটনা চলে আসেন মঞ্জু। সেখানে জি ডি হস্টেলে থেকে পড়াশোনা শুরু করেন। নীতীশ এই সময় মঞ্জুর সঙ্গে দেখা করতে কলেজে বা হোস্টেলের বাইরে অপেক্ষা করতেন। তারা একসঙ্গে সিনেমা দেখতে যেতেন। দাম্পত্য জীবন ভালোই কাটছিল।

এরপর নীতীশ ঠিক করেন রাজনীতিতে যোগদান করবেন। ১৯৭৪ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণ-এর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। এরপর বেশ কয়েকবার জেলে যান তিনি। জেলে তার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন মঞ্জু। বিবাহের পর ১২ বছর পর্যন্ত কোন চাকরি করতেন না নীতীশ কুমার। যার ফলে কিছুটা আর্থিক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল নীতীশ মঞ্জুকে। এই সময় পর পর দু-বার ভোটে দাঁড়িয়ে হারেনও নীতীশ। এই কঠিন সময় তাঁকে মানসিক শক্তি যোগান এবং নৈতিকভাবে তাঁর পাশে থাকেন মঞ্জু। ১৯৮২-তে সরকারি শিক্ষকের চাকরি পান মঞ্জু। তাতে কিছুটা সংসার চালানোর আর্থিক সুরাহা হয়। ১৯৮৫ সালে আবার ভোট লড়ার প্রস্তুতি করেন নীতীশ। কিন্তু ন্যূনতম যে টাকা প্রয়োজন তাও ছিল না। মঞ্জু তার আড়াই বছরের স্কুলের চাকরির জমানো টাকা থেকে কুড়ি হাজার টাকা নীতীশকে দেন। লোকদলের টিকিটে বিধানসভা জিতে যান নীতীশ। হার্নৌত বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়ে নীতীশ সোজা চলে যান নিজের গ্রামের বাড়ি বখতিয়ারপুরে। সেখানে গিয়ে তিনি মঞ্জুকে খোঁজেন। কিন্তু মঞ্জু তখন তার বাপের বাড়িতে ছিলেন। নীতীশ সোজা মোটরসাইকেল করে মঞ্জুর বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। সকলে তাঁকে বারণ করেন যে এখন হোলি, চারদিকে ভিড় তুমি যেও না কিন্তু প্রেমিক নীতীশ কথা শোনেননি। সোজা পৌঁছে যান মঞ্জুর কাছে। প্রসঙ্গত, ১৯৭৫ সালে নীতীশ-মঞ্জুর একমাত্র সন্তান নিশান্ত জন্ম নেন। নীতীশ-মঞ্জু উভয়ই একসাথে থাকতে চাইতেন তাই নীতীশ যখন পাটনায় তখন মঞ্জু ট্রান্সফার নিয়ে পাটনা চলে আসেন। এরপর নীতীশ সাংসদ হন। দিল্লিতে থাকাকালীন একসঙ্গে থাকার তাগিদে মঞ্জু দিল্লিতে ট্রান্সফার নেন। এই নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রচুর চর্চা হয়। ক্ষুব্ধ নীতীশ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব-কে চিঠি লিখে বলেন, এই ট্রান্সফার ক্যানসেল করে দেওয়া হোক।

এরপর থেকে মঞ্জু বিহারের পাটনায় থাকতেন এবং নীতীশ দিল্লিতে থাকতেন। তবে তারা সব সময় চেষ্টা করতেন দুজনে একসঙ্গে থাকার। তাই কখনো নীতীশ পাটনা থাকতেন কখনও মঞ্জু দিল্লিতে যেতেন। বিধায়ক থাকাকালীন নীতীশ প্রত্যেকদিন নিয়ম করে স্ত্রীকে মোটরসাইকেলে করে স্কুলে ছাড়তে যেতেন। এতটাই ছিল দুজনের প্রেম। ২০০৫-এ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর নীতীশ কুমারের সরকারি মুখ্যমন্ত্রীর আবাস পেতে কিছুদিন দেরি হয়। তখন তিনি সরকার দ্বারা নির্ধারিত একটি আবাসে থাকতেন। মঞ্জু, পুত্র নিশান্তকে নিয়ে বাপের বাড়ি থাকতেন। এটা নীতীশের কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। সব সময় তিনি স্ত্রীকে সময় দিতে না পারার আফসোস করতেন। মঞ্জু তাঁকে সান্তনা দিতেন যে, রিটায়ারমেন্টের পর তাঁরা একসঙ্গে থাকবেন। কিন্তু বিধি বাম। ২০১২-তে মঞ্জু সিনহার রিটায়ারমেন্ট ছিল। তার আগেই ২০০৭ সালের ১৪ই মে দিল্লিতে নিউমোনিয়ায় মৃত্যু হয় তাঁর। প্রিয় স্ত্রী বিয়োগ নীতীশকে খুবই যন্ত্রণা দেয়।

আজ কুড়ি নভেম্বর নীতীশ দশ বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিচ্ছেন। কিন্তু এত আনন্দ সত্বেও হৃদয়ের কোণে যেন কাঁটা ফুটছে, মঞ্জু থাকলে কত খুশি হতেন। আনন্দের মধ্যেও চোখে যেন আসছে জল।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*