রোজদিন ডেস্ক, কলকাতা:- সেনাবাহিনীর প্রতি সম্মান জানাতে বিধানসভার অধিবেশনে এই প্রস্তাব এনেছেন স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক অংশগ্রহণ করার কথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর। সেই সঙ্গেই সরকার পক্ষের বক্তা তালিকায় চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, ব্রাত্য বসু, বিরবাহা হাঁসদা, মধুপর্ণা ঠাকুর ও মোশারফ হোসেনের নাম ঠিক করে দিয়েছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। দলীয় সূত্রে খবর, এই আলোচনায় দলের বক্তাদের মন্তব্য ‘বিতর্কহীন’ রাখার জন্য তৃণমূল সতর্ক থাকলেও ইতিমধ্যেই দলের নিশানা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মমতা। বস্তুত, সন্ত্রাস-বিরোধী অভিযানের ওই নামকরণ (‘সিঁদুর’) এবং তার পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে মমতার সমালোচনায় তৃণমূলের আক্রমণাত্মক মেজাজই স্পষ্ট।
এই রেজিলিউশনের উপর প্রথম বক্তৃতা শুরু করেন বিজেপির হবিবপুরের বিধায়ক জুয়েল মুর্মু। সাঁওতাল ভাষায় বক্তৃতা করছেন তিনি। স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তৃতা থামিয়ে দিয়ে বলেন, “আপনি কোন ভাষায় বক্তৃতা করবেন তা আমাদের আগে জানানো উচিত ছিল। শঙ্করবাবু (বিজেপির বিধানসভার মুখ্য সচেতক) আপনি জানাতে পারতেন। তা হলে সে ভাবে ব্যবস্থা করা হোত।” পরে এই বিষয়টি উল্লেখ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর বিধানসভায় বক্তব্য রাখছেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। বিধানসভায় সেনাবাহিনীকে সম্মান জানিয়ে গানও গাইলেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য। তিনি জানান, পাকিস্তানি জঙ্গিরা বেছে বেছে হিন্দুদের খুন করে। কেন এমনটা হল জানা নেই। তবে জঙ্গিহামলা থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিহত হয়েছেন কাশ্মীরের এক টাট্টুওয়ালা। তিনি মুসলমান। তাই এই ‘যুদ্ধ’কে হিন্দু এবং মুসলমানের বলে চিহ্নিত করা উচিত নয়। তার পর বক্তব্য রাখেন বিজেপি বিধায়ক অসীম সরকার। ব্রাত্য বসুর বক্তব্যের কয়েকটি অংশ নিয়ে একমত নন বিরোধী দলনেতা। বিষয়টি দেখে ‘অ্যাডজাস্ট’ করা হবে বলে জানালেন স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্য দিকে, বিজেপির কবিয়াল বিধায়ক অসীম নিজের বক্তব্য গানের মাধ্যমে শোনালেন। তার পর রাজবংশী ভাষায় বক্তৃতা বিজেপির আনন্দময় বর্মণ।
মধ্যপ্রদেশের মন্ত্রী সেনাবাহিনীকে অপমান করেছেন বলায় তৃণমূলের ইটাহারের বিধায়ক মোশারফ হোসেনের মন্তব্যের প্রতিবাদ করলেন শুভেন্দু অধিকারী। পাল্টা মোশারফ বলেন, ‘‘পররাষ্ট্রের প্রেসক্রিপশনে সংঘর্ষ বিরতি মেনে নিতে পারিনি।’’
মোশাররফ হোসেনের বক্তৃতা মাঝখানেই থামিয়ে দেওয়া হল। মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস নিজের আসন থেকে উঠে গিয়ে বিধায়ককে থামান। তাঁর কানে কানে কিছু কথা বলে যান। তার পর দার্জিলিঙের বিজেপি বিধায়ক নীরজ তামাং জিম্বা ইংরেজিতে বক্তৃতা করেন।
এরপর বিধানসভায় আইএসএফের একমাত্র প্রতিনিধি নওশাদ সিদ্দিকি বক্তব্য রাখেন। তিনি বলন, ‘‘জঙ্গিহানার বিরুদ্ধে পথে নামতে চেয়েছিলাম। শিয়ালদহ থেকে মিছিল করতে দেওয়া হয়নি।’’ তৃণমূল বিধায়ক মোশাররফ হোসেনের ‘বাংলার গণতন্ত্র’ নিয়ে ভাষণের জবাবে বললেন নওশাদ সিদ্দিকী। এর পর তৃণমূল বিধায়ক মধুপর্ণা ঠাকুর, বিজেপি বিধায়ক নরহরি মাহাতো, বিরবাহা হাঁসদা বক্তব্য করেন।
এরপর, বিজেপির কুমারগ্রামের বিধায়ক মনোজ ওঁরাও অভিযোগের সুরে বলেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হচ্ছে বিধানসভায়। কিন্তু প্রস্তাবে কেন ‘সিঁদুর’ নাম রাখা হল না? বিধানসভায় প্রশ্ন বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালের। মুখ্যমন্ত্রী ইউপিএ সরকারের আমলে মন্ত্রী থাকলেও ২৬/১১ হামলার বদলা নিতে বলেননি কেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে? প্রশ্ন অগ্নিমিত্রার। যদিও ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সরকারের অংশ ছিলেন না বলে জানান তৃণমূল বিধায়কদের।
এর পর বলতে ওঠেন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য।
অধিবেশন কক্ষে এলেন মুখ্যমন্ত্রী। তখন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বক্তব্য রাখতে শুরু করেছেন।
শুভেন্দুর বক্তব্যের সময় ডেবরার তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীর প্রশ্ন করেন বিরোধী দলনেতাকে, ‘‘ঝন্টু শেখের বাড়ি গিয়েছিলেন? জবাবে শুভেন্দু বলেন, “গিয়েছিলাম। ওঁর বাবার সঙ্গে দেখা করে এসেছি। স্থানীয় বিধায়ক মানিক ভট্টাচার্যকে জিজ্ঞেস করুন।” তৃণমূল পরিষদীয় দল থেকে হুমায়ুনকে চুপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপরই শুভেন্দুর প্রশ্ন, প্রস্তাবে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নাম নেই কেন? সেই নাম যুক্ত করার প্রস্তাব দেন বিরোধী দলনেতা।
এরপর শুভেন্দু নাম নেন ফিরহাদ হাকিম, উদয়ন গুহ, নরেন চক্রবর্তীর। বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে যা বলেছেন তা উল্লেখ করছি না।’’ সঙ্গে সঙ্গে স্পিকার জানান, এই মন্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ যাবে। তৎক্ষণাৎ আপত্তি জানান বিজেপি বিধায়কেরা। তৃণমূল বিধায়করা প্রতিবাদে করায় পাকিস্তানে যাওয়ার পরামর্শ বিরোধী দলনেতার।
ফিরহাদ হাকিম এবং নরেন চক্রবর্তী কিছু না বললেও কিন্তু উদয়ন বলছেন, ‘‘বেশ করেছি, বলেছি। বার বার বলব।’’ অভিযোগ শুভেন্দুর। উদয়নকে চুপ করতে এবং তাঁকে সংযত হতে পরামর্শ দিলেন স্পিকার। অন্য দিকে, শুভেন্দু ‘টার্গেট কিলিং’ এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’ শব্দ প্রস্তাবে যুক্ত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, বাংলা ভাগ নিয়ে আমার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। তাই এ বারও প্রস্তাব গ্রহণ করা হোক। পাল্টা তাঁকে স্পিকার বলেন, ‘‘আপনি সংশোধনী দিতে পারতেন।’’

Be the first to comment