রোজদিন ডেস্ক :
বাম আমলে রাতারাতি তাঁকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করেছিল সরকার, তৃণমূলের পরিবর্তনের সরকার ও তাঁকে ফেরায় নি, দীর্ঘ প্রায় উনিশ বছর পর বিজেপি আমলে তাঁর প্রিয় শহরে এলেন নির্বাসিত কবি তসলিমা নাসরিন। শুধু এলেন ই না, ভরা রবীন্দ্র সদনে তাঁকে সংবর্ধনা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তসলিমা নাসরিনকে বললেন, আপনি বারবার আসবেন। এখানে তাঁর নিরাপত্তা, সুরক্ষার দায়িত্ব ও তাঁর বলে জানিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। গোটা প্রেক্ষাগৃহ তুমুল করতালিতে এই ঘোষণাকে স্বাগত জানান।

আজ সকাল থেকে একের পর এক কর্মসূচিতে ব্যস্ত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এরই মাঝে তিনি আসেন রবীন্দ্র সদনে, তসলিমা নাসরিনকে পুষ্প স্তবক দিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। তাঁকে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিকৃতি উপহার দেন। জানিয়ে দেন, তাঁর জন্য এই শহরের দরজা সব সময় খোলা, যখনই তাঁর ইচ্ছা হবে তিনি চলে আসবেন, বারবার আসবেন।
মুখ্যমন্ত্রীর এই উদার আহবানে রীতিমত আপ্লুত তসলিমা নাসরিনও। তাঁর প্রিয় শহর কলকাতায় প্রায় দীর্ঘ উনিশ বছর পর এসেছেন তিনি। আজ গাঢ় নীল শাড়িতে নীলাম্বরী দৃশ্যত খুশি লেখক – কবি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী এত ব্যস্ততার মধ্যেও যে এসেছেন, তাঁকে সংবর্ধনা দিয়েছেন, তাঁর প্রিয় শহরে আসার সু্যোগ দিয়েছেন, ওঁর এই উদারতায় তিনি কৃতজ্ঞ। বক্তব্যর শুরুতেই তসলিমা বলেন, “আজ আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি। এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে আমার প্রায় ১৯ বছর লেগেছে। নির্বাসিতের মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময় নয়। প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরজা৷ প্রতিটি মাস অপেক্ষা! প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখ। ”

আবেগঘন স্বরে তিনি বলেন, সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পর এখানে এসে মনে হচ্ছে, তিনি শুধু একটি শহরে ফেরেননি, তাঁর হারিয়ে যাওয়া জীবনের একটি অধ্যায়ের কাছে ফিরে এসেছেন। যে ভালবাসা, সম্মান এখানে পেলেন, এর জন্য তিনি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁর এই ফেরার নেপথ্যে ওসমান গণির নিরলস প্রয়াসের কথা বলেন। জানান, প্রায় অসম্ভব বলে মনে হওয়া তাঁর ফেরার বন্ধ দরজায় তিনিই প্রথম সাহস করে কড়া নেড়েছিলেন। তাঁকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। এই রাজ্য ছাড়তে হওয়ায় ব্যথিত লেখকের কথায় আসে রাজ্যের প্রয়াত দুই বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী শিবনারায়ণ রায় ও অম্লান দত্তর নাম। যাঁরা তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, তাঁর ওই ভাবে চলে যাওয়ায় ব্যথিত হয়েছিলেন।।

মৌলবাদীদের সমালোচনা করায় নিজের জন্মভূমি থেকে নির্বাসিত তসলিমা নাসরিন বলেন, লেখকের জীবনকে রক্ষা করা শুধু একজন মানুষকে রক্ষা করা নয়, তাঁর কথা বলার অধিকার, ভিন্ন মত প্রকাশের অধিকার, তাঁর কলমের স্বাধীনতাকেও রক্ষা করা।
যে কোন ধর্মের মৌলবাদের বিরুদ্ধে এখনও তাঁর সাহসী কলম, সাহসী বক্তব্য থামেনি। এখানে আসতে পেরে কৃতজ্ঞ তিনি, এর পাশে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তসলিমা নাসরিন বলেন, কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়। এর বিনিময়ে তিনি নিজের স্বাধীন চিন্তাকে বন্ধক দেবেন না।
আবার মত ভিন্নতা ও তাঁকে অকৃতজ্ঞ করে না বলে জানান। পরিস্কার বলেন, কোন ভাল কাজের স্বীকৃতি দিতে দলীয় আনুগত্যের প্রয়োজন নেই, দ্বিমত প্রকাশ করতেও বিদ্বেষের প্রয়োজন নেই। স্পষ্টবাদী, যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল মুক্ত চিন্তার ধারক ও বাহক তসলিমা নাসরিন দৃপ্ত কন্ঠে বলেন, তিনি কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে এখানে কথা বলতে আসেননি, কোন দলকে পরাজিত করতে ও নয়। তিনি এসেছেন নারীর সমানাধিকার, মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তিবাদ, মুক্ত চিন্তা ও বাক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতে। বলেন, আজকের দিনটি সাক্ষ্য দিচ্ছে ভয়, নিষেধাজ্ঞা চিরস্থায়ী নয়। বন্ধ দরজা চিরস্থায়ী নয়।
১৯৯৪ সালে নিজের দেশ থেকে এই আগস্ট মাসেই নির্বাসিত হয়েছিলেন তিনি, বেদনার সঙ্গে তা স্মরণ করেন। বলেন, এই মাসেই তাঁর জন্ম। এই আগস্ট মাস তাঁর কাছে তাৎপর্য পূর্ণ। আবার এই মাসেই কলকাতা আসা বিশেষ আনন্দের, তা স্পষ্ট করে দেন।
জন্মভূমি বাংলাদেশে ফিরতে না পারলেও সেই দেশের প্রতি তাঁর ভালবাসা এখন ও অটুট। বলেন, বাংলা ভাষাই তাঁর বহনযোগ্য স্বদেশ। যে স্বদেশ তিনি সঙ্গে করে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে বেড়িয়েছেন। এই বাংলায় তাঁর হারিয়ে যাওয়া ঘর খুঁজে পেয়েছিলেন, অত্যন্ত বিষাদঘন স্বরে বলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই বাংলার কোথাও একটি ছোট ঘর ও রইল না!
বাংলাদেশে একের পর এক মুক্ত চিন্তকদের নৃশংস হত্যার প্রসঙ্গও বলেন তসলিমা নাসরিন। নাগরিক অধিকার রক্ষায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে জোরালো সওয়ালও করেন। ভারত ও বাংলাদেশ, দুই দেশেই ধর্মীয় পরিচয়ের উর্ধ্বে দেওয়ানি বিধি দরকার বলেন।
দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল, কারা দরজা খুলেছিল। এই শহরে দীর্ঘ প্রায় উনিশ বছর পর প্রত্যাবর্তন তাঁকে তাঁর হারিয়ে যাওয়া জীবনের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। তিনি আবারও মনে করিয়ে দেন, শেষ অবধি কোন মানচিত্র না, মানুষের ভালবাসাই তাঁর দেশ।

Be the first to comment