বিলেতের দুর্গাপুজো (London durga puja)

Spread the love

মধুপর্ণা ধরচৌধুরি :

দুয়ারে কড়া নাড়ছে দুর্গোৎসব। প্রাণের শহর কলকাতা থেকে সহস্র যোজন দূর হলেও লন্ডন (London) তথা ইউনাইটেড কিংডমে এখন সাজো সাজো রব। ঝকঝকে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে হাল্কা ঠাণ্ডার আমেজ, সবুজ পাতার রঙবদল জানান দিচ্ছে অটম সিজ়ন এসে পড়েছে। ইউকে-তে বসবাসকারী ভারতীয় বাঙালিরাই মূলত দুর্গাপুজোর উদ্যোক্তা হলেও নবরাত্রি উপলক্ষে অবাঙালিরাও সামিল হন বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবে, বিবিধের মাঝে মিলন মহানের দৃষ্টান্ত হয়ে।

ইউকে-তে এবছর ছোট-বড় মিলিয়ে পঁচাশির বেশি দুর্গাপুজো হচ্ছে। বেশীরভাগই ইংল্যান্ডে। যদিও স্কটল্যান্ডে এডিনবরা, গ্লাসগো আর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টও রয়েছে তালিকায়।

দশকের পর দশক বিলেতি জীবনযাপনে সাবেকি বাঙালিয়ানায় লেগেছে আন্তর্জাতিক পরশ। তা বলে তো আর নিজেদের শিকড় ভোলা যায় না। তাই পুজোর দিনগুলিতে রীতিনীতি, ধর্মীয় আচার মেনে, নিষ্ঠাভরে চলে দেবী দুর্গার আরাধনা। পুষ্পাঞ্জলি থেকে আরতি, ভোগ নিবেদন, মন্ত্রোচ্চারণ থেকে ধুনুচি নাচ, বিজয়া দশমীতে সিঁদুর খেলা- সবেতেই সমান উৎসাহ নিয়ে সামিল হন আয়োজক থেকে দর্শনার্থী সকলে। সারা বছরের ব্যস্ততা আর অফিস আউটফিটকে কদিনের জন্য ছুটি দিয়ে প্রবাসী বাঙালিরা আপন করে নেন ধুতি-পাঞ্জাবি-শাড়ির চিরন্তন ঐতিহ্য। জমজমাট আড্ডা আর ভুড়িভোজের থাকে এলাহি ব্যবস্থা।

ইংল্যান্ডে নামী পুজোগুলির মধ্যে রয়েছে সুইস কটেজে ক্যামডেন দুর্গাপূজা, ইলিংয়ে লন্ডন শারদ উৎসব, হ্যারোয় পঞ্চমুখী দুর্গোৎসব, রেডিংয়ে বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটির দুর্গাপুজো- এমন আরও অনেক। হান্সলো, সার্বিটন, ব্রিস্টল, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, লিডস, শেফিল্ড, লুটন বা নটিংহ্যাম- স্থানীয়ভাবে পুজোর আয়োজন করে থাকে প্রবাসী ভারতীয়দের নানা সংগঠন। পুজো হয় মূলত কমিউনিটি সেন্টার, ভিলেজ হল, স্কুল, কলেজ, লাইব্রেরি বা মন্দির প্রাঙ্গণে। লন্ডনের ইলিংয়ে বেঙ্গল হেরিটেজ ফাউন্ডেশন আয়োজিত লন্ডন শারদ উৎসব ইয়োরোপের সর্ববৃহৎ দুর্গাপুজো বলে পরিচিত। অন্যদিকে, লন্ডনের সবচেয়ে প্রাচীন পুজো ক্যামডেন দুর্গাপূজার প্রধান পৃষ্ঠপোষক স্টিল ম্যাগনেট লক্ষ্মীনারায়ণ মিত্তলের সংস্থা। তারাও নিজেদের ইউকে তথা ইউরোপের সবচেয়ে বড় পুজো বলে দাবি করেছেন।

লন্ডনের কাছে স্লাওয়ে স্থানীয় বাঙালিদের উদ্যোগে তৈরি ক্লাব ‘আড্ডা স্লাও’-য়ের পুজো এবার পায়ে পায়ে ছ-বছরে পড়ল। উইকেন্ড হিসেব করে ২৫শে সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচদিনের পুজো হচ্ছে স্থানীয় ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ডে। এক উদ্যোক্তা শুভ্রাশিস পাল জানালেন, কলকাতার ম্যাডক্স স্কোয়ারের আড্ডার নস্টালজিয়া থেকেই মাঠের মধ্যে প্যান্ডেল বানিয়ে পুজোর আয়োজন শুরুর ভাবনা। লন্ডনে যা কার্যত দেখা যায়না। কলকাতার পুজোর আমেজকে বিলেতের মাটিতে তুলে ধরার জন্যই যাবতীয় প্রচেষ্টা। চন্দননগরের আলো, কলকাতা থেকে আনা গঙ্গাজল, অভিজ্ঞ পুরোহিত দিয়ে পুজোর বন্দোবস্ত। মণ্ডপসজ্জা থেকে পুজোর আয়োজনে হাতে হাত মেলান অবাঙালিরাও। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ, গানের পাশাপাশি থাকছে অন্তক্ষরী, ছোটদের জন্য বসে আঁকো, সেরা দম্পতি জুটির মতো নানা প্রতিযোগিতা। সেলফি তোলার ট্রেন্ডকে একপাশে সরিয়ে উদ্যোক্তাদের নতুন সংযোজন- পুজোর নানা মুহূর্তের ফটোগ্রাফি কনটেস্ট। কলকাতার এগরোল থেকে ফুচকা, কচুরি থেকে বিরিয়ানি স্ট্রিটফুডের স্টলে জিভে জল আনা খাবার। বাঙালি পোশাক থেকে গয়নাগাটির স্টলও থাকছে। পুজোর পর বিজয়া সম্মিলনী উপলক্ষে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চলেছেন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী লগ্নজিতা।

অন্যদিকে, বাকিংহ্যামশায়ারে মিল্টন কিন্স আনন্দ ক্লাব কলকাতার মতোই তিথি মেনে ২৮সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচদিনের পুজোর আয়োজন করেছে। বিজয়া দশমী ও দশেরা স্পেশ্যাল উপলক্ষে থাকছে বলিউড নাইট। মনোগ্রাহী এই অনুষ্ঠানের শুরুতেই পারফর্ম করবে মারাঠি মন্ডল মিল্টন কিন্সের ঢোল তাশা পথক। বিদেশের মাটিতে বাঙালির পুজোয় জাতি নির্বিশেষে যা কিনা আখেরে ভারতীয়ত্ব তথা একতার নিদর্শন।

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*