গান্ধী পরিবারতন্ত্র বা হাইকম্যান্ড নির্ভর রাজনীতি কী আজ অতীত

Spread the love

[ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির আজ ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনটি ভারতের ইতিহাসে কালো দিন হিসাবে লিখিত হয়েছে। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। ]

তপন মল্লিক চৌধুরী
এদেশে তিনজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নেহরু-গান্ধী পরিবার থেকে কিন্তু সেই পরিবারের ঐতিহ্য কী আজ সমুজ্জ্বল না কি পুরোটাই ম্লান? যদিও দেশের নতুন প্রজন্মের কাছে জওহরলাল নেহরু কিংবা ইন্দিরা গান্ধী আজ আর ততটা প্রাসঙ্গিক নন, বরং তাদের অবদান অনেক দূর অতীতের ইতিহাস মাত্র, রাহুল বা প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে নিয়ে যতটা ভাবা গিয়েছিল শেষ পর্যন্ত তার সামান্যটুকু নিয়েও প্রশ্নচিহ্ণ ক্রমশ বড় আকার নিচ্ছে।জিছুদিন আগে পর্যন্ত বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছে কংগ্রেসের ২০০৪-২০১৪ শাসনকালের বিতর্ক-দুর্নীতিই প্রধান আলোচ্য ছিল। এরকম পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন কিন্তু এসেই পড়ে যে রাহুল গান্ধী কী তাঁর ‘ভিশন’এই প্রজন্মের কাছে সঠিক ভাবে পৌঁছে দিতে পারছেন? রাহুল এখন রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রাপ্তবয়স্ক, একমাত্র তিনিই নরেন্দ্র মোদীর চিন্তার বিষয়। তবু মনে হয় রাহুল গান্ধীর পাশে একজন ‘অমিত শাহ’র খুব দরকার ছিল, যেমনটা নরেন্দ্র মোদীর ক্ষেত্রে ঘটেছে; নির্বাচন জয়ের কৌশল থেকে জনপ্রিয়তার সিঁড়ি ভেঙে উপরে ওঠা।


কিছু দিন আগে পর্যন্ত কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন বিশ্বাস করতেন যে রাহুল নয়, বরং প্রিয়াংকাই হচ্ছেন সেই ‘গান্ধী’ যিনি এই পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি ও হাইকম্যান্ড নির্ভরশীল রাজনীতিকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন এবং দলকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু প্রিয়াংকা নিজেই সেী দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক ছিলেন না, তিনি রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বকেই কংগ্রেসের জন্য যথেষ্ট মনে করেন। তবে প্রিয়াংকা হয়ত আগামী দিন আরও গুরত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন এবং বৃহত্তর ভুমিকা নিতে পারবেন। কিন্তু কিছুদিন আগে পর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক আবহাওয়া দেখে এটাই মনে হত যে নরেন্দ্র মোদী যেভাবে ভারতের রাজনৈতিক হৃৎস্পন্দন ধরতে পেরেছেন এবং তাকে প্রভাবিত করেছেন, কংগ্রেস সেখানে পুরোপুরি ব্যর্থ। কংগ্রেস আত্মানুসন্ধান করে বের না করলেও এটা আজ আর বলার অবস্থা নেই যে মোদী এখনও ভারতীয় রাজনৈতিক ময়দানে একচ্ছত্র রাজ চালাচ্ছেন। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস দল ২০২৪-এর লোকসভায় কেবল ঘুরে দাড়ানোর ফলাফল নয়, বিজেপির একচেটিয়া রাজকে বহু ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সামনের দিকে হেঁটে চলেছে। কতটা পথ তারা পেরবে সেটা অবশ্য আগামী দিন বলবে।
পবিত্র স্বর্ণমন্দিরের অবমাননা আর খালিস্তানের স্বপ্ন ভেঙে দেওয়ার প্রতিশোধ নিতে ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিহত হন; সাৎওয়ান্ত সিং ও বেয়ান্ত সিং নামে তাঁর নিজেরই দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে। শিখ দেহরক্ষী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করার পর দেশজুড়ে দাঙ্গা বাধে। আট হাজারের মতো লোক নিহত হয়। দিল্লিতেই নিহত হয় তিন হাজার। দাঙ্গা চলে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত। সিবিআই-এর মতে দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু কমকর্তার সহায়তায় এই দাঙ্গা চলে। মায়ের মৃত্যুর পর রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই বলেছিলেন বড় গাছ যখন পড়ে, তখন মাটি কাঁপে। দেশে জরুরি অবস্থার সময়ে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনরত হাজার হাজার শিখকে আটক করে কারাগারে রাখা হলে শিখরা মাঝে মধ্যেই হামলা চালালে সরকার বলত সন্ত্রাসবাদী। ইন্দিরা হত্যার পর সরকারি রিপোর্ট অনুসারে, দু’হাজার ৭০০ জন শিখ নিহত হয়। দিল্লি থেকে ২০ হাজার শিখ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।


প্রসঙ্গত, কংগ্রেস দলে পরিবার তন্ত্র ও হাইকম্যান্ড নির্ভরশীলতার জন্ম দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। নেহরুর জমানায় যে দলটি চলত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, ইন্দিরা গান্ধী সেই কংগ্রেস দলে হয়ে ওঠেন একনায়িকা। কংগ্রেস দলের ক্ষমতাকে তিনি যেমন সম্পূর্ণ নিজের হাতের মুঠোয় রাখতেন তেমনি যত্নের সঙ্গে পালন করতেন পরিবারতন্ত্রকে। যে কারণে ছোট ছেলে সঞ্জয়কে নিজের উত্তরসূরি ঠিক করে ফেলেছিলেন। কিন্তু বিমান দুর্ঘটনায় সঞ্জয়ের আকস্মিক মৃত্যু হলে ইন্দিরার সেই ইচ্ছা সফল হয়নি। তারপরও তাঁর পরিবারবাদ-প্রকল্প থেমে থাকেনি। তিনি বড় ছেলে রাজীবকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। কিন্তু সোনিয়া এবং রাহুলের আমলে পরিবারবাদ ও হাইকম্যান্ড নির্ভরশীলতাই দেশের সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দলটির ক্ষয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ইন্দিরা এবং রাজীব গান্ধীর মর্মান্তিক হত্যাকান্ড দেশের সর্বপ্রাচীন দলটিকে এমন ধাক্কা মারে যে দলের শিরদাঁড়াটাই ভেঙে যায়। যে ভাঙনের শুরু হয়েছিল লালবাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর পরে।


কংগ্রেস দলের সিন্ডিকেট ইন্দিরা গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী করেছিল এক ধরনের ভাবনা নিয়ে। আর ইন্দিরা ক্ষমতা পাওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই দল ভেঙে আলাদা দল গড়ে কংগ্রেসের প্রবীণদের প্রাধান্যকে খর্ব করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কংগ্রেস এক কেন্দ্রীভূত গোষ্ঠী যেখানে তিনিই দলের সর্বেসর্বা। কিন্তু তাঁর এই ক্ষমতায়ন ও পরিবারতন্ত্রের জাঁতাকলে কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তির ক্ষয় হয়। আর ইন্দিরার একনায়িকাতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায় কংগ্রেস দলটি স্রেফ একটি তাঁবেদারদের গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। পরবর্তীতে তাঁর পুত্রবধূও সেই পরিবারবাদকেই টিকিয়ে রাখতে এবং দলটিকে আরও বেশি হাইকম্যান্ড নির্ভরশীল করতে চেয়েছেন। এক সময় এ দেশে রাজনীতি চর্চায় নেহরু ও ইন্দিরা ছাড়া আর কোনও নামই প্রায় উচ্চারিত হত না। কিন্তু আজ আর কি তাঁদের নাম বিশেষ কেউ চর্চা করেন বলে মনে হয় না। বোধহয় রাজনীতির ইতিহাস এভাবেই উত্তর দেয়।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*