উত্তর সম্পাদকীয়
পিয়ালী আচার্য : কলকাতা
রোজদিন ডেস্ক, কলকাতা:- পয়লা ফেব্রুয়ারি ২০০৩ শীতের সন্ধ্যা। অফিস থেকে ফিরে এক কাপ কফি নিয়ে বসেছি। হঠাৎ মোবাইলে ভেসে উঠলো এক বিখ্যাত সিনিয়র সাংবাদিকের নাম। সময় তখন সবে সাড়ে সাতটা পেরিয়েছে। ফোনটা ধরতেই একটা আর্তনাদের মত কথা ভেসে এলো, বললেন খবর শুনেছ কল্পনা চাওলা নেই। শুনে একইসঙ্গে আঁতকে ও শিউরে উঠলাম। সাংবাদিক দাদা বললেন, বিবিসি বা সিএনএন বা কোন বিদেশি চ্যানেল দেখো। যোগ করলেন আমি বিবিসিতে দেখছি তুমিও দ্যাখো। সাংবাদিকতায় পাঁচ -ছ়য় বছরের অভিজ্ঞতা তখন আমার। অনেক মৃত্যু সংবাদ শুনেছি ,মৃত্যু সংবাদ কভারও করেছি।তখন আমার বয়স পঁচিশ।খবরটা দেখে হঠাৎই এই অনাত্মীয় মহিলা নভশ্চর এর জন্য বুকটা টনটন করে উঠেছিল। মাত্র ৪০ বছর বয়সে এক প্রতিভার অপমৃত্যু। এক লহমায় কল্পনা অতীত হয়ে গেলেন। মনে হল যেন বাস্তব নয়, কল্পনার অতীত। ভুলে গেলাম তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নভোচারী, ভুলে গেলাম তিনি ভারতীয় বংশদ্ভূত মহাকাশযান বিশেষজ্ঞ।
চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক সপ্রতিভ মেয়ে,একগাল হাসি নিয়ে যে কল্পনাকে রূপ দেয় বাস্তবে। একথা অনেকেরই জানা যে কলম্বিয়া নভোযান বিপর্যয়ে যে সাত জন মহাকাশচারী এবং ক্রু মৃত্যুবরণ করেন তাঁদের মধ্যে একজন কল্পনা চাওলা। এটাও প্রায় সবাই জানেন যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত তিনিই প্রথম মহিলা যিনি মহাকাশে পাড়ি জমান। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে কল্পনা নাসাতে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৯০ এ মার্কিন নাগরিক হন। তাঁর প্রথম মহাকাশ যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৭ সালে ১৯ নভেম্বর। তিনি প্রথম মার্কিন ভারতীয় মহিলা হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। দ্বিতীয়বার স্পেস ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম ১০৭এ করে, ১৫ দিন ২২ ঘন্টা কুড়ি মিনিট 32 সেকেন্ড মহাকাশে থেকে গবেষণা চালান। জানুয়ারি ১৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ১, পৃথিবীতে অবতরণের ঐতিহাসিক কিন্তু বিপদসংকুল মুহূর্তে প্রবল ঘর্ষণে মারা যান কল্পনা সহ ৭ নভচারী।

ভারতীয়দের মহাকাশ অভিযানের কথা বলতে গেলে উইং কমান্ডার রাকেশ শর্মার কথা প্রথমেই উল্লেখ করতে হয়। ১৯৮৪ সালের ৩ এপ্রিল সোভিয়ে ইন্টারকসমস প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে সয়ূজ টি ১১ এ মহাকাশযানে উড্ডয়ন করেন তিনি। রাকেশ শর্মা সালিউত ৭মহাকাশ স্টেশনে ৭ দিন ২১ ঘন্টা ৪০ মিনিট সময় কাটান। তাঁর টিম ৪৩ টি বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। তাঁর কাজ ছিল বায়োমেডিসিন এবং রিমোট সেন্সিং। রাকেশ শর্মার মহাকাশ থেকে ভারতকে দেখে মনে হয়েছিল সারে জাঁহা সে আচ্ছা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে পৃথিবী থেকে প্রশ্ন করেন বহির্মহাকাশ থেকে ভারতকে কেমন দেখায়? তার উত্তরে ইকবালের এই লাইন তিনি উচ্চারণ করেন।
আরেক মার্কিন ভারতীয় অ্যাস্ট্রোনট সুনিতা উইলিয়ামস ওরফে সুনি। ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন বা আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রের কমান্ডার। ৬০ ছুঁই ছুঁই এই মহাকাশচারী অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা এবং সবচেয়ে অভিজ্ঞ মহিলা নভচারি। ২০২৪ সালে তিনি বোয়িং স্টারলাইনারের প্রথম মনুষ্যবাহী মিশন বোরিং ট্রু ফ্লাইটেস্টে ইন্টারন্যাশনাল স্টেশনে ফিরে আসেন তার পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন ১৮ই মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত বিলম্বিত হয়। সুনী মহাকাশে ২৮৬ দিন ছিলেন। ১৮ ই মার্চ ২০২৫ এ তার প্রত্যাবর্তন। ৯ মাসের মিশন শেষে তিনি ক্রুনয়ের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ১৮ /৩/২৫ মঙ্গলবার সন্ধ্যেবেলা ফ্লোরিডার Talahasi উপকূলের কাছে মেক্সিকো উপসাগরে নিরাপদ অবতরণ করে পৃথিবীতে ফেরেন। সুনিতা কেও প্রশ্ন করা হয়েছিল ভারতকে মহাকাশ থেকে কেমন লাগে? তিনি বলেন ভারতকে অপূর্ব লাগছিল যতবার হিমালয়ের উপর দিয়ে গেছি বুচ উইলমার দুর্দান্ত কিছু ছবি তুলেছেন ।ভাষায় প্রকাশ করা যায় না ভারত এত সুন্দর। সুনিতার লড়াই ও শুধু মহাকাশচারী বা মহিলাদের কাছে নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে শিক্ষণীয়।। জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু ভারতীয় রক্ত শরীরে। তাই ১৮ ই মার্চ রাত জেগেছিল ভারত, প্রহর গুনে ছিল ,দেখেছিল সুনিতার সফল অবতরণ।

আজ এই প্রসঙ্গের অবতারণা যখন করছি তখন সারা বিশ্ব জেনে গেছে শুভ সংবাদ। আজ ভারতের শুভ দিন। রাকেশ শর্মার পর ভারতীয় হিসেবে শুভাংশুই মহাকাশে পা রাখলেন। ১৮ দিনের জার্নি শেষে পৃথিবীতে শুভাগমন। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন ওয়েলকাম হোম। সত্যিই তো বসুধৈব কুটুমবকম আমাদের শিরায় মজ্জায় নাড়িতে। সারা পৃথিবীতো একটা বিশ্ব সংসার। তাই পৃথিবীতে ফেরা মানেই ঘরে ফেরা হোক না সে সুদূর মার্কিন মুলুক। গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু ও তার টিম অনেক গবেষণার মধ্যে ডায়াবেটিস নিয়েও গবেষণা করেছেন। সুভাংশু আরও একটি রেকর্ড করেছেন। তিনি প্রথম ভারতীয় যিনি ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে গেলেন। শুভাংশু মানে শুভ রশ্মি। আবার অংশু মানে সূর্যও।
আজ মঙ্গলবার শুভাংশুর এক্সিওম ফোর মিশনের ড্রাগন যখন স্প্লাশডাউন করছিল তখন রাতের মার্কিন মুলুকের আকাশে এক অদ্ভুত সবুজ উজ্জ্বল রশ্মির ছটা। আর ভারতে তখন অপরাহ্ণের সূর্য আলো দিচ্ছে।। মনে পড়ছিল একটি গানের কলি-ভারত বর্ষ সূর্যের এক নাম/আমরা রয়েছি সেই সূর্যের দেশে।


Be the first to comment