চিরন্তন ব্যানার্জি,কলকাতা:- ১ জুলাই তারিখ এলেই মাথায় আসে প্রখ্যাত চিকিৎসক তথা বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, ও বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়ের কথা। কিন্তু, জানেন আজকের দিনেই জন্মেছিলেন আরেক প্রখ্যাত বিশিষ্ট চিকিৎসক যার পদবীও ছিল রায়। যিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্বর্ণপদক নিয়ে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পরেও আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় নিজেকে সপে দিয়েছিলেন। তৈরি করে গিয়েছিলেন কলকাতাতেই এশিয়ার প্রথম আয়ুর্বেদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালও। কিন্তু এই মহান চিকিৎসক যামিনী ভূষণ রায়কে মানুষ ভুলে গেছে। খুব কম লোকই জানেন যে এই মহান চিকিৎসকের জন্ম আজকের দিনেই অর্থাৎ ১ জুলাই তারিখে হয়েছিল।
ডাক্তার যামিনী ভূষণ রায়ের জন্ম ১৮৭৯ সালের ১লা জুলাই অবিভক্ত বাংলার খুলনা জেলার (বর্তমানে বাংলাদেশে) পয়োগ্রাম গ্রামে। গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি কলকাতার ভবানীপুরের সাউথ সাবারবান স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার প্রসিদ্ধ সংস্কৃত কলেজ থেকে সংস্কৃতে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯০৫ সালে তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ব্যাচেলর অফ মেডিসিন (যা এখন ব্যাচেলর অফ মেডিসিন অ্যান্ড ব্যাচেলর অফ সার্জারি বা এমবিবিএস) ডিগ্রি লাভ করেন এবং একাডেমিক উৎকর্ষতার জন্য স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। সেই সময়ে এলোপ্যাথি সাফল্যের নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু তিনি আয়ুর্বেদের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান রাখেন। এলোপ্যাথির চাকচিক্যে হারিয়ে যাওয়া আয়ুর্বেদকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন তিনি। তখনই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সে যুগের নেতৃস্থানীয় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক কবিরাজ মহাপাধ্যায় বিজয়রত্ন সেনের কাছ থেকে আয়ুর্বেদ পাঠ শুরু করেন। এরপর মাত্র চল্লিশ টাকা মাসিক বেতনের জন্য কবিরাজ হিসেবে ভাড়া করে বাগালা মারোয়াড়ি হাসপাতালে কর্মজীবন শুরু করেন।
১৯১৫ দ্বারা তিনি আয়ুর্বেদিক ঔষধ ক্ষেত্রে এক ধরনের খ্যাতিমান ব্যক্তি ছিলেন, এবং ঐ বছর মাদ্রাজের সপ্তম সর্বভারতীয় আয়ুর্বেদিক সম্মেলনের সভাপতি নির্বাচিত হন। দক্ষিণাঞ্চলীয় এই সফরকালে তিনি মাদ্রাজ আয়ুর্বেদিক কলেজের কার্যকারিতা এবং সুযোগ-সুবিধা দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ হন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি তাঁর জন্মভূমি কলকাতায় একই ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করবেন।
এরপরই, ১৯১৬ সালে তিনি কলকাতার ফাড়িয়াপুকুর স্ট্রিট এলাকায় একটি আয়ুর্বেদিক হাসপাতাল চালু করেন। এর ৯ বছর পর ১৯২৫ সালে তিনি মহানগরীরই রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটে আয়ুর্বেদিক সংস্থানের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা আজ রাজ্যের জে.বি. রায় আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতাল নামে পরিচিত। এই মেডিক্যাল কলেজের শিলান্যাস করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। ২০১৬ সালে কলেজ তাঁর শতবার্ষিকী উদ্যাপন করেছে।
ডাক্তার রায় বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ সম্পর্কে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই লিখে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে রোগ বিনিশ্চয়, শালাক্য তন্ত্র, কুমার তন্ত্র এবং বিষ তন্ত্র। তিনি “আয়ুর্বেদ” নামে একটি মাসিক পত্রিকাও শুরু করেছিলেন, যা সমগ্র বাংলায় আয়ুর্বেদ সম্পর্কে সচেতনতা ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা ছড়িয়ে দিতে সহায়ক হয়েছিল।
অন্যদিকে, ডাক্তার জে.বি. রায় রোগীর নাড়ি ধরেই রোগ নির্ণয় করতে পারতেন। নাড়ি পরীক্ষায় তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। তাঁর আয়ুর্বেদ চিকিৎসা এবং মডার্ন মেডিসিন (এলোপ্যাথি) উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষ ছিলেন। ডাক্তার রায়ই প্রথম আয়ুর্বেদিক পাঠ্যক্রমে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি এবং পোস্টমর্টেমের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি যুক্ত করেছিলেন। তিনি আয়ুর্বেদিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছিলেন। মৃত্যুর আগে ডাক্তার জামিনী ভূষণ রায় আয়ুর্বেদের উন্নয়নের জন্য এক লক্ষ টাকারও বেশি দান করে গিয়েছিলেন। ১৯২৬ সালের ১১ই আগস্ট মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর সম্মানে অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদ হাসপাতালের অদূরে কলকাতার একটি রাস্তার নাম রাখা হয়েছে যামিনী কবিরাজ রো। তার মৃত্যুর ৭ বছর পর – পাতিপুকুরতার তার বাগান বাড়িতে, পাতিপুকুর টিবি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশিষ্ট চিকিৎসক, মুক্তিযোদ্ধা এবং পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
রাজ্যের একজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক ডাক্তার সুমিত সুর জানিয়েছেন, জে.বি. রায় প্রতিষ্ঠিত এই মেডিক্যাল কলেজ এশিয়ার প্রথম আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠান। এমন প্রতিষ্ঠান স্থাপনকারী চিকিৎসককে জাতীয় সম্মান দেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, ২০২০ ও ২০২১ সালে আয়ুষ মন্ত্রক দ্বারা ডাক্তার জে.বি. রায়ের জন্মজয়ন্তীতে টুইট করা হয়েছিল। রাজ্যের বিরোধী দলের নেতাও ডাক্তার জে.বি. রায়ের সম্মানে টুইট করেছিলেন। আরেকজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, “যেভাবে বিধান চন্দ্র রায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন, সেভাবে জামিনী ভূষণ রায় ছিলেন একজন সর্বপ্রধান আয়ুর্বেদ চিকিৎসক, তিনি অবিভক্ত বাংলায় ভারতের প্রাচীনতম আয়ুর্বেদ কলেজের অগ্রণী ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ডাক্তার্স ডে-তে আমরা এই দুই মহান আত্মাকে সমান সম্মানে শ্রদ্ধা জানাই।”

Be the first to comment