বৃষ্টি হলেই কলকাতা জলে ভাসে কেন

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী :

সোমবার রাতভর বৃষ্টির পরের সকালে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলার মানুষ। বেশিরভাগ মানুষই বলছেন, এমন বৃষ্টি তাঁদের জীবদ্দশায় তাঁরা দেখেননি। দেখা যাক আবহাওয়া দফতর কলকাতার বৃষ্টি নিয়ে কী বলছে? তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কলকাতায় গড়ে ৩৬৯.৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। তার আগে ১৯০৮ সালের ১৮ জুন কলকাতায় ৩০৩.৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল। তথ্য অনুযায়ী ২৩ সেপ্টেম্বর ২৫১.৪ মিমি বৃষ্টি হয়েছে, যা ১৯৭৮ সালের পর সেপ্টেম্বর মাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ একদিনের বর্ষণ। এই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির কারণে নাজেহাল সাধারণ মানুষ সাম্প্রতিক আরও কয়েকটি ঘটনার প্রেক্ষিতে আরও অসহায় বোধ করছেন। তাদের সামনে ভেসে উঠছে গত মাসের বেঙ্গালুরুর বন্যা পরিস্থিতি যাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে গোটা শহর। লক্ষ্যাধিক মানুষের ঘরবাড়ি-আসবাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বলা হয় গত ১০০ বছরে সেখানে নাকি এমন ভয়াবহ বন্যা হয়নি। চলতি বছর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আসাম, মণিপুর এবং নাগাল্যান্ড-এ ভয়াবহ বন্যায় লক্ষাধিক মানুষ চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত সেপ্টেম্বর মাসে বন্যায় বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাঞ্জাব। ইউনাইটেড ইন সায়েন্স-এর একটি রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে জলবায়ুর পরিবর্তন ও প্রত্যেক বছর উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে শহরগুলিতে অতিরিক্ত বৃষ্টি হচ্ছে এবং শহরগুলি বন্যার কবলে পড়ছে।

কলকাতায় বৃষ্টি হলেই উত্তর কলকাতার আমর্হাস্ট স্ট্রিট, ঠনঠনিয়া, কলেজ স্ট্রিট, বিধান সরণি জলমগ্ন হওয়ার ঘটনাটি যেন বহুকালের রীতি। সেই রীতিনীতির কিছুই তেমন রদবদল হয়নি। তার সঙ্গে দুর্ভোগের অন্ত থাকে না বেহালা, ঠাকুরপুরকুর অঞ্চল, যেখানে তিন-চার দিনেও জল নামেনা। জল জমার সমস্যা আছে দক্ষিণ কলকাতা ছাড়াও এলগিন রোড, খিদিরপুর, ভবানীপুর, গড়িয়াহাট, ঢাকুরিয়া, গোলপার্ক এলাকাতেও, এমনকি ইএম বাইপাসেও জল জমে। প্রসঙ্গত, কলকাতা শহরের আকৃতিটা এমন যে ঘণ্টায় ৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলেই জল জমে। তবে শহরের জমা জল সরানোর জন্য বেশ কিছু পাম্পিং স্টেশন আছে। ভারী বৃষ্টির জল নামানোর জন্য গঙ্গার সঙ্গে আছে ৮টি লক গেট। যার ৫টি উত্তর কলকাতায় এবং ৩টি দক্ষিণ কলকাতায়। শহর বৃষ্টির জলে উপছে পড়লে লকগেটগুলি খুলে দেওয়া হয়। সেই জল গিয়ে পড়ে গঙ্গায়। কিন্তু জোয়ারের সময় গঙ্গার জলস্তর নিকাশি নালার সমান হয়ে যায় বলে লক গেট বন্ধ রাখা হয় কারণ, খোলা থাকলে গঙ্গার জল শহরে ঢুকে যেতে পারে। এছাড়াও কলকাতায় নিকাশী ব্যবস্থা নেই এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এত কিছু ব্যবস্থা স্বত্বেও কলকাতায় এত জল জমে কেন? যদিও কল্পকাতায় কিছু জায়গা আছে যেখানে ২০০ মিমি বৃষ্টি হলেও জল জমে না।

কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। কিন্তু এতগুলি শতাব্দী পেরনো সেই ব্যবস্থার কি সময় উপযোগী রদ-বদল ও সংস্কারসাধন হয়েছে? উত্তর কলকাতার অনেকটা অংশের বয়স ৫০০ বছর বা তার বেশি, সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই বড় নিকাশি নালাগুলির অবস্থা কী? নয় ভূগর্ভে ভেঙে পড়েছে তা-নাহলে বহুকালের ব্যবহারে ধস নেমে বুজেই গিয়েছে। সেগুলির কি সংস্কার হয়েছে? যতদূর জানা যায় পুরনো কলকাতার কোনো নিকাশি নালা সংস্কারই হয়নি। বিগত বামফ্রন্ট জমানাই হোক কিংবা বর্তমান তৃণমূল জমানা- নতুন করে শহরজোড়া পয়ঃপ্রণালী বা তার সংস্কার নিয়ে উল্লেখ করার মতো কোনো ভাবনা চিন্তা কি হয়েছে? পরিকাঠামো গঠনের চেষ্টা বা স্বদিচ্ছার উদাহরণ কি দেওয়া যাবে? কিন্তু পুরসভার বাজেটে প্রতিবছরই নিকাশি খাতে মোটা বরাদ্দ ধার্য হয়। এমনকি নিকাশি সমস্যা সমাধানে পুরনিগমের ঋণও রয়েছে। তাহলে প্রতি বর্ষায় কেন জলযন্ত্রণায় নাকাল শহরবাসী- এই ছবিটাই ঘুরেফিরে আসে?

এই শহরের বাসিন্দাদের কু-অভ্যাসের সুমহান ঐতিহ্য আছে। যে কারণে বারবার সতর্ক করা স্বত্বেও প্লাসটিকের ব্যবহার কমা তো দূরের কথা ক্রমে বেড়েই চলেছে। যেখানে সেখামে ময়লা ফেলা নিয়ে বাসিন্দারা একেবারেই সতেচন নন। ফলে নর্দমা, নিকাশি নালা প্লাসটিক সামগ্রী আর নানা ধরনের জঞ্জালে জমাট বেঁধে থাকে, ফলে জল যেতে পারে না, জল উপচে গিয়ে কলকাতা ভাসে। তাছাড়া নিকাশি নালা থেকে নিয়মিত পলি তোলা পুরসভার অন্যতম দায়, তা কি পুরসভা পালন করে? পূর্ব কলকাতার জলাভূমি যেখানে কলকাতার নিকাশি জল গিয়ে পড়ে, সেগুলিও বিরাট বিরাট অট্টালিকা নির্মাণের ফলে বুজে যাচ্ছে। নিকাশি খালগুলি নিয়মিত সংস্কারের অভাবে ভরাট হতে বসেছে। তাহলে কিছুই কি হয়নি? সংস্কারের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে, আন্তর্জাতিক পুরষ্কার জুটেছে, খালপাড়ে বসতি গড়ে উঠেছে, শহরের সর্বত্র সৌন্দর্যায় হয়েছে- শহর উন্নয়নের এমন পরিসংখ্যান আছে দিস্তা দিস্তা কিন্তু তারপরও বৃষ্টি হলেই কলকাতা জলমগ্ন হয়, শহরবাসীর ভোগান্তির সীমা থাকে না।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*