জনপ্রিয়তার কারণেই কণিকার গাওয়া রবীন্দ্রগানের সুর বিকৃতি মেনেছিল বিশ্বভারতী

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী :
জনপ্রিয় তো অনেকেই হন কিন্তু সবাই কী মনোপ্রিয় হতে পারেন? গানের ক্ষেত্রে একথার পরেই যদি বলি অনেক সময়ে শিল্পীর কন্ঠের গান (কথায় ও সুরে) শ্রোতাদের এমন মোহবিষ্ট করে যে সেই গানের গুণেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। আবার এমনটিও ঘটে শিল্পীর গায়কীর মধ্যে এতটাই গভীরতা ও আবেগের প্রকাশ ঘটে যে শ্রোতারা মুগ্ধ হন। রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীদের মধ্যে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় যে অন্যতম তার কারণ অবশ্যই তাঁর গায়কী। কিন্তু কি সেই গায়কী যেখানে তিনি অন্য সবার থেকে আলাদা এবং অনন্য। তাঁর নিজের কথা দিয়েই বলা যায়, ‘আমি যখন রবীন্দ্রনাথের গান গাই তখন এই জগতের সবকিছুই ভুলে যাই’। জগত সংসারের সবকিছু ভুলে তিনি তাহলে কোন ভাবনায় ডুব দিতেন? দেবেশ রায়ের কথায় বলি, ‘গায়ক সংগীতটি রচনা করে তুলছেন শব্দ, সুর দিয়ে। ঐ রচনার আগে ঐ সংগীতটি ছিল না। প্রতিটি গাওয়াই মৌলিক রচনা। প্রতিবারই গানটি নতুনতম রচিত হচ্ছে, রচনার প্রয়োজন থেকে গাওয়া হচ্ছে, গাইতে-গাইতে শোনা হচ্ছে। একজনই এই তিন কাজ করছে কোনও অলৌকিক গায়নে’। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিল সেই অলৌকিক গায়ন ক্ষমতা। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ও যেন অনেকটা এই কথার সমর্থনে তাঁর নিজের ভাষায় বলেন, “তাঁর গান যখন গাই তখন সেই সুরের সঙ্গে, কথার সঙ্গে, আমার সঙ্গে আর প্রকৃতির সঙ্গে যেন কোনও পার্থক্য খুঁজে পাই না। কথা সুর, পরিবেশ আর আমি নিমেষে এক…”
হ্যাঁ কণিকা গানের মূল ভাবের উপর জোর দিতেন, তাঁর গায়কী থেকে আবেগের সূক্ষ্মতা প্রকাশ পেত। কিন্তু তাঁর গায়কী শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক রীতি থেকে আলাদা ছিল না, বরং সেই প্রতিচ্ছবি ছিল খুব স্পষ্ট। তাঁর গায়কীর মধ্যে টপ্পা-অঙ্গের উপর তাঁর যে দক্ষতা সেটিও ধরা পড়তো খুব সহজ-সরল ভাবে, অথচ শান্তিনিকেতনের আশ্রিত যে ভাব সেটি বজায় রেখেও নিজের গায়কী ও নিজস্ব সত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতেন। শ্রোতাদের মনোনিবেশ করাতেন আবেগপূর্ণ উপস্থাপনায়। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গায়কীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল গভীর আধ্যাত্মিকতা। তাঁর গায়কীর মধ্যে ছিল আত্মস্থতা ও বিনয়। শান্ত ও গভীর আবেশে গেয়ে চলা গানে ছিল না কোনো প্রকার আড়ম্বর। এইসব মিলে তাঁর অলৌকিক গায়ন ক্ষমতায় রবীন্দ্রনাথের গান হয়ে উঠেছিল নীরবতার সঙ্গীত। ইন্দিরা দেবী চৌধুরী, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শৈলজারঞ্জন মজুমদার এবং শান্তিদেব ঘোষ প্রমুখ সঙ্গীতজ্ঞদের কাছে রবীন্দ্র-সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ, পণ্ডিত ভিভি ওয়াজলওয়ার থেকে হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এসরাজ, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ ও প্রকাশকালী ঘোষালের কাছে ভজন, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের পিতা হরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে অতুলপ্রসাদের গান এছাড়াও কমল দাশগুপ্ত ও ফিরোজা বেগমের কাছে কিছুকাল নজরুলগীতি- স্বভাবতই তাঁর কণ্ঠস্বর বা কণ্ঠবাদনে সুরের ‘স্বরস্থান’ অমন নিখুঁত ভাবে ফুটে উঠত। বহু খ্যাতনামা বাদ্যযন্ত্রীরা বলতেন তাঁর স্বরের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রে সুর বাঁধা যায়।
যদিও কণিকা প্রথমে (১৯৩৮) নীহারবিন্দু সেনের কথায় ও হরিপদ চট্টোপাধ্যায়ের সুরে ‘ওরে ওই বন্ধ হল দ্বার’ ও ‘গান নিয়ে মোর খেলা’এই দুটি আধুনিক গান রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রিয় ছাত্রী জীবনের প্রথম রেকর্ডটি তাঁর গানের পরিবর্তে আধুনিক বাংলা গান করায় দুঃখ পাওয়াতে কণিকা আধুনিক গানের জগত থেকে সরে দাঁড়ান। তবে ওই বছরই হিন্দুস্তান রেকর্ড কোম্পানি থেকে ‘মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে’ এবং ‘ডাকব না, ডাকব না’ তাঁর প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই ‘ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে’ ও ‘ওই মালতীলতা দোলে’ গান দুটি রেকর্ডে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ এই চারটি গান শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন বলে জানা যায়। ১৯৫৬ সালে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেকর্ড করা ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ গানটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিল। জানা যায়, এই গানটি তিনি শিখেছিলেন সংগীতাচার্য রমেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে, কিন্তু রমেশবাবু গানটির মূল সুরটি জানতেন না, তিনি স্বরবিতান-সম্মত মিশ্র মালকোষ রাগের বদলে কণিকাকে গানটি শিখিয়েছিলেন শুদ্ধ মালকোষ রাগে। অথচ রবীন্দ্রনাথের গানে এই ধরনের সুর বিকৃতির পরও বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতি সেটি কেবল অনুমোদনই করেনি, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্ঠে মিশ্র মালকোষ রাগের বদলে শুদ্ধ মালকোষ রাগে গাওয়া সুরটির স্বরলিপি ভি বালসারাকে দিয়ে লিখিয়ে তা স্বরবিতানভুক্ত করে। এর কারণ গানটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যার প্রভাব বিশ্বভারতী এড়িয়ে যেতে পারেনি। জনপ্রিয়তার প্রভাব এমনই যার কারণে কণিকা নিজেও গানটি আরও দুবার রেকর্ড করেছিলেন কিন্তু সেই একই সুরে, জনপ্রিয়তার উল্টো দিকে গিয়ে গানটি মূল সুরে গাইবার সাহস তিনিও দেখান নি। তারপরও অন্যান্য যে শিল্পীরা গানটি রেকর্ড করেন তাঁরাও সুর-বিকৃতির উল্টো পথে হাঁটার চেষ্টা করেন নি।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*