মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে নজর রেখে সিএএ শুনানিতে গতি, মোদির সফরের আগেই তৎপর কেন্দ্র

Spread the love

রমিত সরকার, কৃষ্ণনগর:
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নদীয়া সফরের ঠিক আগে হঠাৎ করেই সিএএ শুনানির গতি বাড়িয়েছে কেন্দ্র। বাংলায় এসআইআর চালু হওয়ার পর থেকেই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষজন। নাগরিকত্ব-নথি নিয়ে তাঁদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। ফলে বিজেপির উপর ভরসার মাটি খানিক নড়ে গিয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। মতুয়া অধ্যুষিত কয়েকটি এলাকায় ক্ষোভ জমাট বেঁধেছে।

এই পরিস্থিতিতে মতুয়াদের মন ফেরাতেই সিএএকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে সামনে আনছে কেন্দ্রীয় সরকার—এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। সেই কারণেই কেন্দ্রের নির্দেশে নদীয়া জেলায় সিএএ শিবিরগুলোকে নতুন করে চাঙ্গা করতে মরিয়া বিজেপি নেতৃত্ব। আবেদনের সংখ্যা যেভাবে হু হু করে বাড়ছে, তা সামলাতে এবার শুনানির টেবিল বসছে কৃষ্ণনগর হেড পোস্ট অফিসেও। নতুন অফিসারও নিযুক্ত করা হবে। এমনকি থাকবেন আইবি কর্মকর্তারাও।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখেই সিএএ প্রক্রিয়ায় দ্রুততা আনার লক্ষ্য স্পষ্ট।
নির্ধারিত অনুযায়ী সবকিছু ঠিকঠাক চললে আগামী ২০ ডিসেম্বর রানাঘাটে সভা করবেন মোদি। এলাকা পরিচিত ‘মতুয়াগড়’ নামে। এসআইআর কার্যকর হওয়ার পর এখানকার বহু মানুষ দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।

ইতিপূর্বেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঠাকুরনগরে পদযাত্রা ও সভা করে মতুয়াদের উদ্দেশে আশ্বাস দিয়েছেন। সেই পাল্টা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই মোদির রানাঘাট সভাকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিজেপি। দলীয় মহলের মতে, নাগরিকত্ব প্রদানের আশ্বাসই হবে প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় বার্তা। এমন কিছু ঘোষণা বা প্রতীকী উদ্যোগও সভা মঞ্চে থাকতে পারে, যা সরাসরি মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলবে।
কৃষ্ণনগর সাংগঠনিক জেলার বিজেপির সহ-সভাপতি রঞ্জন অধিকারী বলেন,
“আমরা সিএএ শিবিরে জোর দিচ্ছি। যত বেশি মানুষ নাগরিকত্ব পান, সেটাই এখন লক্ষ্য।”

জেলায় মে-জুন মাস থেকে সিএএ শুনানি শুরু হলেও গত কয়েক মাসে আবেদনের চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার আবেদনকারীর শুনানি বাকি। সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ২ হাজার।

এতদিন শুধু কৃষ্ণনগরের পোস্টাল সুপারিনটেনডেন্ট অফিসেই প্রতিদিন গড়ে ৪০-৪৫ জনের শুনানি হত। এখন সেই চাপ এতটাই বেড়েছে যে হেড পোস্ট অফিসেও সমান্তরাল শুনানি চালাতে বাধ্য হয়েছে কেন্দ্র।

ডাক বিভাগের এক কর্তা জানান, “এখন প্রতিদিন গড়ে ৪২ জন আবেদনকারীর শুনানি হচ্ছে। বাইরে থেকে অফিসার আসবেন। প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতেই এই উদ্যোগ।”

শুনানিতে হাজির হতে আবেদনকারীদের হলফনামা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শংসাপত্রসহ একাধিক নথি জমা দিতে হচ্ছে। কিন্তু সব নথি দেওয়ার পরও নাগরিকত্ব কার্ড কবে মিলবে, তা নিয়ে আবেদনকারীদের দুশ্চিন্তা থেকেই যাচ্ছে।
এমন সময়েই রাজ্যে চালু হয়েছে এসআইআর। নদীয়ার বেশ কয়েকটি ‘গেরুয়া-মরুদ্যান’ এলাকায় বহু মানুষের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই প্রবণতা বিজেপির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশেষ করে মতুয়াদের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করাই এখন তাদের বড় চ্যালেঞ্জ।

এর মধ্যেই আরেক বিতর্ক—সিএএ শুনানি প্রক্রিয়ায় জেলা প্রশাসন বা পুলিশ প্রশাসনকে না-জড়ানোয় উঠেছে প্রশ্ন। স্থানীয় রাজনৈতিক মহল এই সিদ্ধান্তকে “অস্বাভাবিক” বলেই অভিহিত করছে।

তৃণমূলের চাপড়া বিধায়ক রুকবানুর রহমান বলেন, “ভোটের আগে সিএএ-র নামে মানুষকে ভুল বোঝাতে গাজর ঝোলাচ্ছে বিজেপি।”
সিএএ শুনানির গতি বাড়ানো, এসআইআর নিয়ে উদ্বেগ, এবং তার সঙ্গে মোদির সফরের সমন্বয়—সব মিলিয়ে নদীয়ায় রাজনৈতিক তাপমাত্রা চড়া। মতুয়া ভোটব্যাঙ্ককে ঘিরে আগামী কয়েকদিন আরও বড় রাজনৈতিক নড়াচড়া হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে রয়েছেন আবেদনকারীরা। নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি এবার তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় বদলায় কি না—এখন সেই অপেক্ষাই।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*