প্রথম দুর্গাপুজো (durga puja)

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী : 

দুর্গাপুজোর (durga puja) সঙ্গে জড়িয়ে আছে রামায়ণের কাহিনি। সেই রামায়ণ থেকেই জানা যায়, ত্রেতাযুগে শরৎকালে রামচন্দ্র দুর্গাপুজো  করেছিলেন। তিনি তাঁর শত্রু লঙ্কেশ্বর রাবণকে পরাস্ত করার জন্য সমুদ্রতটে দেবী দুর্গার উপাসনা করেছিলেন। তবে রামচন্দ্র শরৎকালে যে দুর্গাপুজো করেছিলেন, সেটা ছিল অকালে। কারণ দুর্গাপুজোর নিয়ম ছিল বসন্তকালে। সেই কারণেই দুর্গার আরেক নাম বাসন্তী। রামচন্দ্রের অকালে দুর্গাপুজো থেকেই এর নাম হয় অকালবোধন। কৃত্তিবাস তাঁর রামায়ণে লিখেছেন, রামচন্দ্র নিজে দুর্গার বোধন ও পুজো করেছিলেন। তবে রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি তাঁর রামায়ণে রামচন্দ্র যে দুর্গাপুজো করেছিলেন তার কোনো উল্লেখ করেন নি। উপরন্তু রামায়ণের অন্যান্য অনুবাদেও এর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়না। তবে প্রচলিত তথ্য অনুসারে স্মৃতিশাস্ত্রসমূহে শরৎকালে দুর্গাপুজোর বিধান দেওয়া হয়েছে। হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে, “…অকালবোধন শরতে বৈদিক যজ্ঞের আধুনিক রূপায়ণ ছাড়া আর কিছুই না। তবে দুর্গাপুজোকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মিথও প্রচলিত আছে। রামচন্দ্রের অনেক আগে সত্যযুগেই দুর্গাপূজার সূচনা হয়। ধার্মিক রাজা সুরথ শত্রুদের চক্রান্তে রাজ্য হারিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে ঘুরতে মেধস মুনির আশ্রমে হাজির হয়েছিলেন। মেধস মুনি রাজা সুরথের দুর্দশা দেখে তাঁকে হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য দুর্গাপুজো করার উপদেশ দেন। মুনির উপদেশ মেনে রাজা সুরথ দুর্গাপুজো করেন। দেবী দুর্গার আশীর্বাদে রাজা সুরথ শত্রুদের পরাস্ত করে নিজের রাজ্য উদ্ধারের পর থেকে দুর্গাপুজো প্রচলিত হয়।

কিন্তু দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল সেই মেধস মুনির আশ্রম নিয়ে ঐতিহাসিক কোনো তথ্য মেলে না। উল্লেখ্য, ইতিহাস ও মিথ্ কেবল ভিন্ন বিষয় নয় দুটির গতিপ্রকৃতিও ভিন্ন। ইতিহাসপূর্ব ঘটনার প্রতীকী উপস্থাপনা হলো মিথ, কিন্তু আধুনিক সময়েও মিথ তৈরি হয় নানাভাবে। যেমন শতাধিক বছর আগে বেদানন্দ স্বামীর উদ্যোগে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর করলডেঙ্গার পাহাড়ে চন্ডী, শিব, তারা, কালীসহ বিভিন্ন দেবদেবীর মোট ১০টি মন্দির-সহ গড়ে ওঠে মেধস মুনির আশ্রম। তিনি নাকি দৈবক্ষমতায় জেনেছিলেন এই ঠিকানা। বোয়ালখালী উপজেলা সদর থেকে আট কিলোমিটার দূরে মধ্যম করলডেঙ্গা গ্রামের করলডেঙ্গা পাহাড়ের চূড়ায় এই আশ্রম। প্রধান ফটক দিয়ে প্রায় আধ কিলোমিটার ভিতরে ঢুকলে উপরে ওঠার সিঁড়ি। আর ১৪০টি সিঁড়ি ভেঙে উঠলে মেধস মুনির মন্দির। সেই মন্দিরের পর দেবী চন্ডীর মূল মন্দির। এর এক পাশে সীতার পুকুর, পেছনে রয়েছে ঝরনা। প্রায় ৬৮ একর জায়গাজুড়ে ওই মন্দিরে প্রতিবছর মহালয়ার দিন হয় দেবীপক্ষের সূচনা।

জানা যায়, পুরাকালের এই আশ্রমের কথা শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ থাকলেও সাধারণের মধ্যে তার প্রচার ছিল না। শতাধিক বছর আগে বেদানন্দ স্বামী এই মেধস মুনির আশ্রম যখন আবিষ্কার করেন সেই সময় জঙ্গল পার হয়ে আশ্রমে আসতে হত। পরবর্তীতে আশ্রমটি গড়ে ওঠে ভক্ত–অনুরাগীদের অনুদানে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই মন্দিরের উপর ধ্বংসযজ্ঞ চলেছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গোলা বারুদ দিয়ে আশ্রমটি জ্বালিয়ে দেয়। ধ্বংসাবশেষ থেকে লুট করে নেয় প্রতিমা। প্রায় সাত বছর বন্ধ ছিল আশ্রম। পরবর্তীতে পাথরের মূর্তি দিয়ে পুনঃস্থাপন করা হয় মন্দিরটি। মেধস মুনির আশ্রমকে দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল হিসেবে গণ্য করা হয়। রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি নিজেদের দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতে এখানে এসেছিলেন। ঋষি মেধস তাঁদের দেবী দুর্গার আরাধনা করতে বলেন এবং প্রথম দুর্গোৎসবের পাঠ দেন। সেই পুজো ছিল প্রথম মাটির প্রতিমায় দুর্গাপুজো, যা মূলত বাসন্তী পুজো নামে পরিচিতি পায়। মেধস আশ্রমের নিজস্ব প্রকাশানায় অধ্যাপক সচ্চিদানন্দ রায় চৌধুরী লিখেছেন,  সপ্তসতী চণ্ডী গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে মেধস ঋষির আশ্রমের কথা আছে।  কিন্তু দেবী তীর্থ মেধস আশ্রম কোথায়, কোন রাজ্যের কোন প্রদেশে সেটা কোনো পুরাণশাস্ত্রে সুনির্দিষ্টভাবে বলা না থাকায় এই মন্দির কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়।  সত্যযুগের এই আদিপীঠ কালক্রমে হারিয়ে গেলেও ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে স্বামী বেদানন্দ এই আশ্রম নতুন করে আবিস্কার করেন বলে তিনি লেখায় উল্লেখ করেছেন। শারদীয়া দুর্গাপুজো আর বাসন্তীপূজার রীতি প্রায় একই রকম। বাসন্তীপূজার চল এখনও আছে তবে বাঙালিরা শারদীয় দুর্গাপুজোকেই প্রধান পার্বণ হিসেবে বেছে নিয়েছে।

রাধারমণ রায়ের লেখা থেকে জানা যায়, আকবরের রাজত্বকালে ১৫৮০ সাল নাগাদ তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ বাংলাদেশে প্রথম শারদীয়া দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। তারও আগে হত বাসন্তী পুজো আর শরৎকালে হত নবপত্রিকা পূজা। নবপত্রিকাই কালক্রমে চার পুত্র-কন্যাসহ দেবী দুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তিতে রূপান্তরিত হয়। স্বামী বেদানন্দ তাঁর সংস্কৃতে রচিত ‘মেধসাশ্রম মাহাত্ম্য’ (অনুবাদ  দেবেন্দ্র বিজয় বসু)-তে লিখেছেন,  এখানেই প্রথম মৃন্ময়ী মূর্তিতে প্রথমবারের মতো পুজো হয়েছিল।  সেই থেকে প্রতিবছর মহালয়ার দিন দেবী পক্ষের সূচনা হয় এই মন্দিরে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*