গত শুক্রবার, ৭ নভেম্বর সত্যজিত রায় মেমোরিয়াল লেকচারে ‘শোলে’-র পরিচালক রমেশ সিপ্পি কলকাতার সিনেমা প্রেম, ভালো ছবির প্রতি ভালোবাসার কথা প্রসঙ্গে বলেন, বাঙালির সিনেমা প্রেম তাঁকে বারবার আপ্লুত করে। তিনি যে একশো ভাগ ঠিক কথা বলেছেন সেটা রবিবার ছুটির দিন খুব টের পাওয়া গেল। ‘হাউ কাম ইটস অল গ্রিন আউট হেয়ার’, সার্বীয় চিত্রপরিচালক নিকোলা লেজাইক নির্মিত এই ছবিটি দেখতে শহরের সিনেমা প্রেমীরা দুপুর ২টোর আগেই যেভাবে নন্দনে ভীড় করেছেন তা দেখে যে কারোরই আপ্লুত না হয়ে কোনো উপায় থাকে না। ছবিটি ৭ জুলাই ২০২৫, ৫৯তম কার্লোভি ভ্যারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হয়েছিল, যেখানে তিনি প্রক্সিমা গ্র্যান্ড প্রিক্সের জন্য প্রতিযোগিতা করেছিলেন। এই খবর সিনেমাপ্রেমী মাত্রই জানা আছে। আর খোঁজ-খবর আগে থেকে নেওয়া থাকে বলেই কোন কোন ছবি এই ক’দিন দেখতে হবে সেই নির্বাচনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো ভুলচুক হয়না।
‘কিভাবে সব সবুজ হয়ে গেল?’ সেই ঘটনা দেখা গেল নিকোলা নামে একজন সিনেমা পরিচালককে ঘিরে নির্মিত ১১০ মিনিটের ‘Kako je ovde tako zeleno?’ ছবিটিতে। নিকোলা বিজ্ঞাপন ছবির দুনিয়ায় আটকে পড়লেও, তিনি একটি পুরানো ভ্যান কিনে সেটিকে ক্যাম্পারে পরিণত করার পরিকল্পনা করেন এবং ভবিষ্যতে তার স্ত্রী এবং তাদের শীঘ্রই জন্ম নেবে শিশুকে নিয়ে রোড ট্রিপের স্বপ্ন দেখেন। ইতিমধ্যে নিকোলা জানতে পারেন যে তাঁর প্রয়াত পিতামহী একসময় যিনি শরণার্থী শরনার্থী হয়েছিলেন, তাঁকে তাঁর জন্মস্থান ডালমাটিয়াতে সমাহিত করা হতে পারে, তখন নিকোলা তার ৭৪ বছর বয়সী বাবা মিরকোকে নিয়ে সেই সুদূর পথে যাত্রা শুরু করে। ২৫ বছর ধরে তিনি যে বাড়িটি দেখেননি সেখানে যান, একই সঙ্গে পিতামাতা, পরিবার, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতির ঝাপসা প্রকৃতি সম্পর্কে অপ্রত্যাশিত অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করেন। ছবিটি যে একটি আত্মজীবনীমূলক বিবরণ সেকথা জোর দিয়ে বলা না গেলেও আত্মজীবনের একটি ছায়াপট তো অবশ্যই। কিন্তু এটি কোনো রোড ট্রিপের ছবি নয়, বরং এটি স্মৃতির অবিশ্বস্ততা এবং পরিচয়ের দৃঢ়তার মধ্য দিয়ে একটি যাত্রা। নিকোলা শেষবার যখন তার দাদীর বাড়িতে গিয়েছিলেন তখন তাঁর ন’বছর বয়স এবং তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর বেশিরভাগ স্মৃতিই একটি নির্মাণ।
বিকেল চারটের ছবি ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ (ফরাসি: L’Étranger), ফ্রান্সোইস ওজোন ছবিটি বানিয়েছেন আলবার্ট কামুর ১৯৪২ সালের উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে। ছবিটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়েছিল ৮২তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতায় ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, সেখানে ছবিটি গোল্ডেন লায়ন-এর জন্য মনোনীত হয়েছিল। ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ একজন ফরাসি আলজেরিয়ান, তাঁর এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা এবং উদাসীনতাকে ঘিরে ছবি শুরু হলেও তিনিই তাঁর মায়ের শেষকৃত্যের কয়েক সপ্তাহ পরে আলজিয়ার্সে একজন নামহীন আরব ব্যক্তিকে পরপর পাঁচবার গুলি করে হত্যা করে বসেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিচারে একই সঙ্গে অপরাধ এবং তিনি কেমন চরিত্রের মানুষ- এই দুয়ের অন্বেষণ করা হয়। ছবির এই ঘটনাটিকে অস্তিত্ববাদের একটি যুগান্তকারী কাজ হিসাবে বিবেচিত করাই যায় কারণ, এটি কামুর মাস্টারপিস হিসাবে অনেক কাল আগেই বিবেচিত। এটি বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত ফরাসি উপন্যাসগুলির মধ্যে একটি এবং ৭৫টি ভাষায় অনূদিত। প্রসঙ্গত, ওজনের এই ছবিটির আগে ১৯৬৭ সালে ইতালীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা লুচিনো ভিসকন্টির ক্যামুর ‘স্ট্রেঞ্জার’কে চলচ্চিত্রে রূপান্তর করেছিলেন, সেই ছবিতে মার্সেলো মাস্ত্রোইয়ান্নি মুরসল্টের ভূমিকায় অভিনয় করেন। আর ২০২৫ সালে ফ্রান্সোইস ওজোন নির্মিত এই ছবিতে বেঞ্জামিন ভয়েসিন। বইটিতে, ক্যামুর স্ট্রেঞ্জার পাঠে একজন আকর্ষণীয় প্রথম পুরুষের বর্ণনা। ওজন এই সমস্ত কিছুকে খণ্ডন করে একটি সাহসী কৌশল অবলম্বন করেছেন কিন্তু সেটি যে সব সময় কার্যকরি হয়েছে তা বলা যাবে না। ভয়েসিনের অবশ্যই একটি আকর্ষণ আছে, কিন্তু তিনি চরিত্রটির উদাসীনতা, জটিলতা পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে কতখানি সফল হয়েছেন তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ছবিটি যে ওজোনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছবি সে কথা বলতেই হবে। ক্যামুর লেখায় ছিল একটি দার্শনিক অনুরণন, ছবিটি সেই প্রতিলিপি করার খুব চেষ্টা করেছে কিন্তু কতটা পেরেছে তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে।

Be the first to comment