রমিত সরকার, নদীয়া :
কৃষ্ণগঞ্জের এক সরু গলিতে ঢুকলেই দূর থেকে ভেসে আসে টুপটাপ আওয়াজ। কাছে যেতেই বোঝা যায়—সেই আওয়াজ আসছে নারকেলের মালা থেকে। উঠোনে বসে মালা গাঁথছেন গৃহবধূ পাপিয়া কর (Papiya Kar)। পাশে তাঁর স্বামী, পেছনে খেলা করছে বাচ্চারা। চারপাশে ছড়ানো নারকেলের খোসা, শাঁস, আর সুতোর গুচ্ছ। যেন একটা ছোট্ট কর্মশালা।
“প্রথমদিকে সবাই হাসাহাসি করত,” মনে পড়ে গেল পাপিয়ার। “বলত, এসব দিয়ে আবার প্রতিমা হয় নাকি? কিন্তু আমার জেদ ছিল, হবেই। মাটির মা তো সবাই করে, আমি ভেবেছিলাম ভিন্ন কিছু করতে হবে।”

পাপিয়ার ছোটবেলাটা কেটেছে সাদামাটা এক গ্রামে। পুজোর সময় চারপাশে সাজসজ্জা, আলো, নতুন জামাকাপড়—সবকিছুর ভিড়ে এক জিনিসই তাঁর মনে দাগ কেটেছিল।
“গ্রামের অনেক বাচ্চা তখন নতুন জামা পেত না। সবার আনন্দে ওরা থাকত এক কোণে। তখনই মনে হয়েছিল, বড় হয়ে যদি কিছু করি, ওদের জন্য করব।”
এই ভাবনাই তাঁকে নিয়ে গেছে আজকের জায়গায়।
গত পনেরো বছর ধরে তিনি ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করছেন। কাগজ, প্লাস্টিক, বোতল, খইল—সবই তাঁর হাতে নতুন রূপ পেয়েছে। কিন্তু এবারের চমক অন্যরকম।

প্রায় পাঁচ হাজার নারকেলের মালা দিয়ে তৈরি হয়েছে এবারের মা দুর্গা। প্রতিমার উচ্চতা আট ফুট, প্রস্থ দশ ফুট। আলো পড়লেই শাঁসের সাদা ঝিলিক মায়ের গায়ে আলোর আভা ছড়ায়। প্রতিমার সামনে দাঁড়ালে দর্শকের চোখ আটকে যায়।
পাপিয়া বললেন,“প্রথম দিন যখন মালা জোড়া লাগানো শুরু করলাম, তখন মনে হয়েছিল অসম্ভব। কিন্তু প্রতিদিন একটু একটু করে এগোতে থাকলাম। এখন যখন দেখি মা দাঁড়িয়ে আছেন, মনে হয় যেন নারকেলও আশীর্বাদ দিয়েছে।”
এই প্রতিমা বানাতে মাসের পর মাস লেগেছে। পাপিয়ার পাশে ছিলেন তাঁর স্বামী আর এক ছাত্র। সন্ধে নামলেই তারা সবাই মিলে বসতেন মালা গাঁথতে।
স্বামী বললেন,“প্রতিদিন সন্ধে মানেই আমাদের কাছে একটা উৎসব। কাজের মাঝে খুনসুটি, আবার মালা গোনার ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে দারুণ সময় কেটেছে।”
স্থানীয় মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন প্রতিমা দেখতে। একজন প্রবীণ দর্শক বিস্মিত কণ্ঠে বললেন,
“আমাদের সময়ে মা মানেই ছিল কাদা আর খড়। কিন্তু আজ নারকেলের মালা দিয়ে মা দাঁড়িয়ে আছেন এটা ইতিহাস হয়ে থাকবে।”
দূর থেকে আসা এক কলেজ পড়ুয়া মেয়ে বলল,
“এটা শুধু শিল্প নয়, একটা বার্তা। পরিবেশবান্ধবও, আবার সমাজসেবামূলকও।”
প্রতিমা বিক্রি করে যে অর্থ আসে, তা পাপিয়া নিজের বাড়িতে রাখেন না। প্রতিবছর সেই টাকা দিয়ে দুঃস্থ শিশুদের জন্য নতুন জামাকাপড় কেনেন।
“ওরা যখন নতুন জামা পরে হাসিমুখে পুজো কাটায়, তখনই মনে হয় আমার মা পূর্ণতা পেলেন। আমার কাছে এটাই আসল আনন্দ,” বললেন পাপিয়া।
পাপিয়া কর আজ শুধু একজন শিল্পী নন। তিনি এক সমাজসেবার প্রতীক। তাঁর প্রতিমা প্রমাণ করে পুজো মানে শুধু আলো, সাজসজ্জা নয়। পুজো মানে ভাগ করে নেওয়া, অন্যকে খুশি করা।
নারকেলের মালা গেঁথে গড়া এই মা তাই আজ শুধু শিল্প নয়, মানবিকতারও প্রতিচ্ছবি।


Be the first to comment