তপন মল্লিক চৌধুরী :
বিষয়টি সংক্ষেপে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন। কিন্তু জনপ্রতিনিধিত্বমূলক আইনের কোথাও কি বলা আছে যে পাঁচ বা দশ কিংবা কত বছর পর পর রাজ্য জুড়ে বিধানসভা নির্বাচনের আগেই ভোটার তালিকার ‘বিশেষ সংশোধন’ কর্মসূচি পালন করতেই হবে তা নাহলে নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়ে করা যাবে না। বরং বলা আছে রাজ্য বা দেশ জুড়ে যদি সাধারণ নিয়মের অন্তর্ভুক্ত সংশোধনী না হয়, তাহলেও নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়ে হবে। তাহলে ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বিষয়টির অর্থ কী বা সেটি নতুন কোন মাত্রা তৈরি করছে? ১৯৫০ সালের জন প্রতিনিধিত্ব আইনের ধারা ২১-এর যে তিনটি উপধারা আছে তার তিন নম্বর উপধারাতে শুধুমাত্র ‘বিশেষ সংশোধনী’ করার কথা বলা আছে। কোথাও ‘intensive’ বা নিবিড় কথাটির উল্লেখ নেই। বরং উপধারাতে স্পষ্ট বলা আছে, বিশেষ সংশোধনী শুধুমাত্র একটি কেন্দ্রে বা সেই কেন্দ্রের অংশে হতে পারে, সমগ্র রাজ্যে নয়। তার মানে কী নির্বাচন কমিশন জেনে বুঝে সংবিধান বিকৃত করছে অথবা বিশেষ উদ্দেশ্য বা সবার্থেই করছে এবং শাসক দলের এজেন্ডা পূরণের কারণে সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূত পথেই করছে?
২০০২ সালে নিবিড় সংশোধনের জন্য ৮ মাস সময় লেগেছিল। তাহলে এবার কেন এত তাড়াহুড়ো? কমিশন বলছে, বিদেশিদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া তাদের ‘সাংবিধানিক দায়িত্ব’। এছাড়া পরিযায়ী হিসেবে বা নানা কারণে অন্য রাজ্যে গিয়ে যারা সেখানে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছে, তাদের নামও দু’জায়গায় থাকা উচিত নয়। তাই অন্য রাজ্যের ভোটার ও মৃত ব্যক্তিদের নামও বাদ দিতে এই সংশোধন জরুরি। কিন্তু কমিশন বলছে, আধার কার্ড, রেশন কার্ড এমনকি তাদের দেওয়া ভোটার আইডি কার্ড প্রামাণ্য নথি হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশ্ন, নাগরিকত্বের নির্ণায়ক মানদণ্ড ঠিক করাটা নির্বাচন কমিশনের কাজ? তার কাজ আধার কার্ড, রেশন কার্ড ও সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র সহ নির্ধারিত ১১টি নথির যে কোনোটির দ্বারা ভোটারের পরিচিতি যাচাই করা, নির্ভুল তালিকা তৈরি করা এবং সেই তালিকার ভিত্তিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা। কিন্তু কমিশন নিবিড় সংশোধনের নামে কোন কাজ করেছে? সম্প্রতি কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনে কমিশনের বিরুদ্ধে কাবচুপি করে লক্ষ লক্ষ ভুয়ো ভোটারের নাম ঢোকানো, ডুপ্লিকেট ভোট, ভুয়া ঠিকানা, বিরোধী দলগুলিকে ডিজিটাল ভোটার তালিকা না দেওয়া, সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে অস্বীকার করা ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।
প্রশ্ন, যাঁদের চাকরি নেই বা কখনও ছিল না তাঁরা কীভাবে চাকরির পরিচয়পত্র বা পেনশনের কাগজ দেখাবেন? ১৯৮৭ সালের আগে কতজন মানুষের ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস অ্যাকাউন্ট, এলআইসি পলিসি ছিল? ওই সময় কতজনের জন্ম সার্টিফিকেট ছিল? শিক্ষার সুযোগ যাঁরা পাননি, তাঁরা কীভাবে শিক্ষাগত সার্টিফিকেট দেখাবেন? অধকাংশ গরিব মানুষের যেসব কাগজ কোনোদিন ছিলনা বা যা তাঁদের নেই, কমিশন সেইসব কাগজপত্রকেই নথি হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছে, যেগুলির কোনো একটি না থাকলেই তিনি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়বেন! কেবল তাই নয়, বাদ পড়বেন কোনো কালে শিক্ষার সুযোগ ছিল না যাদের সেই আদিবাসী, পিছিয়ে পড়া এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের গরিব মানুষ। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এসআইআরে ২২.৩ লক্ষ মৃত, ৩৬.৩ লক্ষ স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত, ৭ লক্ষ জনের নাম একাধিক জায়গায় রয়েছে স্বভাবতই তারা বাদ গিয়েছে। কিন্তু কমিশন কি একজনকেও বিদেশি বলে চিহ্নিত করতে পেরেছে? কমিশনের যে খসড়া তালিকায থেকে সব থেকে বেশি বাদ গেছে ১৮ থেকে ৪০ বছরের ভোটার, এদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ মহিলা এবং অধিকাংশই মুসলিম ও দলিত সম্প্রদায়ের। এনআরসি-র নাম করে আসামে সরকার ১৯ লক্ষ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। বিহারেও৬৫ লক্ষ, নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী বিহারের মতো সারা দেশেই ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন করা হবে এবং অসংখ্য মানুষের জীবনে বিপর্যয় নামবে।
সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য সঠিক ভোটারদের একটি নির্ভুল তালিকা তৈরি হল এসআইআর-এর উদ্দেশ্য। যেটি পরিচালনা করছে ভারতের নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়া। সামগ্রিক ভোটার তালিকার সংশোধনের কাজও বছরে ৪ বার হয়, যাকে বলা হয় এসআরইআর। সাধারন ভাবে প্রতি বছর অক্টোবর মাসে এই কাজ হয় এবং পরের বছর ১ জানুয়ারি নতুন খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়। কিন্তু এবার নির্বাচন কমিশন হঠাৎ কেন এসআরইআর এর পরিবর্তে এসআইআর করছে? তাহলে স্বাধীনতা পরবর্তী এসআরইআর-এর পুরো কাজটাই…? পুরনো নথিপত্র যাদের হারিয়ে অথবা নষ্ট হয়ে গিয়েছে, তারা দিনের পর দিন সরকারী দপ্তরে দৌড়ঝাঁপ করে, হয়রান হয়ে, দালাল চক্রের পাল্লায় পড়েও সেসব কাগজ উদ্ধার করতে পারবেন্? সাধারন মানুষকে নাকাল করতেই যে ঔপনিবেশিক কাঠামোয় গড়া আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা , যেখানে নানা পথে এবং নানা ভাবে অর্থচক্র-এর পাতা জাল, নুন আনতে পান্তা ফুরায় যে মানুষগুলির, যে ৮০ কোটি মানুষ ২ টাকা কিলো চালের আশায় ঘন্টার পর লাইন দেন, তাঁরা কি পারবেন হারিয়ে যাওয়া, নষ্ট হয়ে যাওয়া ২০/২৫ বছর আগের নথিপত্র যোগাড় করতে?
২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় যাদের বাবা-মায়ের নাম আছে তাঁকেও কেন প্রমাণ দিতে হবে যে তিনি এদেশের নাগরিক? বছর বছর বন্যার কবলে পড়া মানুষ কিংবা এখানে ওখানে ঘুরে ঘুরে রোজগার করতে হয় যাদের, তাঁরা ২০/২৫ বছর আগের তাঁদেরে বাপ-ঠাকুর্দার নথি যত্ন করে কোথায় রাখবেন? হটাৎ ফরমান দিয়ে আধার কার্ড, রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড রাতারাতি বাতিল। বিহারে যে ৬৫ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেল, তার ৭৫-৮০ শতাংশ মানুষই হতদরিদ্র। কেউ খেতমজুর, কেউ পরিযায়ী শ্রমিক, কেউ ভূমিহীন কৃষক, কেউ গৃহ পরিচারিকা। এর পিছনে ত্যো কোনো সঙ্গত কারণ বা যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে কি গোটাটাই একটা বিরাট ষড়যন্ত্র?

Be the first to comment