১৮ বছরে স্বপ্নপূরণ ১৮ নম্বর জার্সির বিরাটের

Spread the love

রোজদিন ডেস্ক, কলকাতা:- এ বার আইপিএলের আগে সম্প্রচারকারী চ্যানেল একটা বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিল। রেস্তরাঁয় খেতে গিয়ে ‘১৮’-এর যোগ দেখছিলেন কোহলি। তারিখ ১৮। রেস্তোরাঁর টেবিল নম্বর ১৮। এমনকি, খাওয়ার শেষে লিফটে তিনি যাবেন কোন তলায়? ১৮! বিজ্ঞাপন বলেছিল, আইপিএলের অষ্টাদশ সংস্করণে কি চ্যাম্পিয়ন হবেন ১৮ নম্বর জার্সিধারী?হল। বিরাটরাজের হাত ধরে সাবালক হল আঠারোর আইপিএল। অর্থাৎ, আইপিএলের ১৮তম বছরে ট্রফি উঠল ১৮ নম্বর জার্সিধারীর হাতে। গত ১৭ বছর ধরে দেখা স্বপ্ন পূরণ হল বুধবার রাতে। খেলা শেষ হতে তখনও চার বল বাকি। বাউন্ডারিতে দাঁড়িয়ে চোখ ঢেকে ফেললেন কোহলি। চোখের কোনা দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল। খেলা শেষ না হলেও তত ক্ষণে বেঙ্গালুরুর জয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। তাই নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি কোহলি। শেষ বল হতেই মুখ ঢেকে মাটিতে বসে পড়লেন তিনি। মাথা ঠেকালেন মাটিতে। ডাগআউট থেকে ছুটে এসে তাঁকে তখন ঘিরে ধরেছেন দুই সতীর্থ। কিছু ক্ষণ পর উঠে দাঁড়ালেন কোহলি। বাকিরা ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে। তত ক্ষণে গ্যালারিতে নেমেছে টিফো। সেখানে কোহলির মাথায় দেখা গেল মুকুট। পাশে লেখা, ‘এভরি সিঙ্গল ওয়ান অফ আস লাভস বিরাট কোহলি।’ লাল বলের ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া কোহলির জন্য তাতে ছিল শুভেচ্ছাবার্তাও।
সতীর্থ, কোচ, বন্ধুরা পাশে থাকলেও তখনও কোহলির চোখ এক জনকে খুঁজছিল। বার বার গ্যালারির দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি। অবশেষে তাঁকে দেখতে পেলেন কোহলি। তিনি অনুষ্কা শর্মা। তাঁর সব লড়াইয়ের সাক্ষী। দু’বছর আগে এক দিনের বিশ্বকাপের ফাইনালে এই মাঠেই অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে কাঁদতে কাঁদতে স্ত্রী অনুষ্কাকে জড়়িয়ে ধরেছিলেন কোহলি। এ বারও তাই করলেন। তবে সেই কান্না ছিল দুঃখের। স্বপ্নভঙ্গের। এই কান্না আনন্দের। স্বপ্নপূরণের। কারণ আইপিএল চ্যাম্পিয়ন রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে প্রথমে ব্যাট করে আরসিবি ৯ উইকেট হারিয়ে করে ১৯০ রান তোলে। বিরাট কোহলি করেন ৪৩ রান। জবাবে ২০ ওভার ব্যাট করে ১৮৪ রানে শেষ হয়ে যায় পাঞ্জাবের ইনিংস। ৬ রানে ম্যাচ জিতে ১৮তম আইপিএল ট্রফি ঘরে তুলল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। অন্যদিকে এবারও ট্রফি অধরা রইল পাঞ্জাব কিংসের।
আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে ১৮তম আইপিএলের ফাইনালে পরস্পর মুখোমুখি হয় রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু ও পাঞ্জাব কিংস। এদিন টসে জিতে আরসিবিকে প্রথমে ব্যাট করতে পাঠান পাঞ্জাব অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার। আরসিবি’র হয়ে ব্যাট করতে নামেন বিরাট কোহলি ও ফিল সল্ট। শুরুতেই ঝড় তুললেন ফিল সল্ট। প্রথম ওভারে ছক্কা-চারের সাহায্যে সল্ট অর্শদীপ সিংয়ের বলে তুললেন ১৩ রান। দ্বিতীয় ওভারেই ধাক্কা খায় আরসিবি। ভালো শুরু করেও ক্যাচ আউট হলেন ফিল সল্ট। কাইল জেমিসনের বলে শ্রেয়স আইয়ারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি। তিনি করেন ৯ বলে ১৬ রান। ম্যাচের ৬.২ ওভারে চাহালের বলে আউট হন মায়ঙ্ক আগরওয়াল।
দুই উইকেট পড়লেও দলের রান এগিয়ে নিয়ে যান বিরাট কোহলি এবং আরসিবি অধিনায়ক রজত পাতিদার। ১৬ বলে ২৬ রান করে জেমিসনের বলে এলবিডব্লিউ হলেন বেঙ্গালুরু অধিনায়ক। আরসিবি’র রান ৩ উইকেট হারিয়ে ৯৬। ৩৫ বলে ৪৩ রান করে ওমরজাইয়ের বলে আউট হন বিরাট কোহলি। কোহলি আউট হতেই একেরপর এক উইকেট হারাতে থাকে পাতিদারের দল। ১৫ বলে ২৫ রান করে এলবিডব্লু হন লিভিংস্টোন। রিভিউ নিয়েও লাভ হয়নি। দলের রান ৫ উইকেট হারিয়ে ১৬৭। লিভিংস্টোনের পর আউট জিতেশ শর্মা। ভিশাকের বলে বোল্ড হলেন তিনি। ১০ বলে ২৪ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে যান জিতেশ। আরসিবি’র রান ৬ উইকেট হারিয়ে ১৭১। শেষবেলায় একের পর এক উইকেট পড়ল আরসিবি’র। শেষ পর্যন্ত বেঙ্গালুরুর রান দাঁড়াল ৯ উইকেটের বিনিময়ে ১৯০। একসময় মনে হচ্ছিল রানটা অনায়াসে দুশোর উপর উঠে যাবে। কিন্তু কুড়িতম ওভারের দ্বিতীয় বলে শেফার্ডকে আউট করেন অর্শদীপ। চতুর্থ বলে ফেরান ক্রুণাল পাণ্ডিয়াকে। শেষ বলে আউট হন ভুবনেশ্বর কুমার। শেষ দু’রানে পরে তিনটি উইকেট। পাঞ্জাবের হয়ে তিনটি করে উইকেট অর্শদীপ সিং ও কাইল জেমিসনের।
১৯১ রানের লক্ষ্যে পাঞ্জাবের হয়ে প্রথমে ব্যাট করতে নামেন প্রিয়াংশ আর্য ও প্রভসিমরন সিং। প্রথম ওভার থেকেই হাত খুলে ব্যাট করতে শুরু করেন পাঞ্জাব কিংসের দুই ওপেনার। প্রথম তিন ওভারেই উঠে যায় ২৮ রান। তবে হ্যাজেলউডের বলে প্রভসিমরনের সহজ ক্যাচ মিস রোমারিও শেফার্ডের। ৫ ওভারের মাথায় হ্যাজেলউডের বলে আউট হন প্রিয়াংশ আর্য। ১৯ বলে ২৪ রান করেন তিনি। বাউন্ডারিতে দুরন্ত ক্যাচ ধরেন ফিল সল্ট। পাঞ্জাব ৪৪ রানে হারায় ১ উইকেট।
৮ ওভারের মাথায় বড় ধাক্কা খেল পাঞ্জাব। ক্রুণাল পাণ্ডিয়ার বলে আউট হন প্রভসিমরন সিং (২৬)। পরের ওভারেই পড়ে যায় অধিনায়কের উইকেট। আউট হন শ্রেয়স আইয়ার। রোমারিও শেফার্ডের বলে ক্যাচ আউট হলেন পাঞ্জাব অধিনায়ক। মাত্র ১ রানে উইকেটের পিছনে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন শ্রেয়স। পাঞ্জাবের রান ৩ উইকেট হারিয়ে ৭৯। পরপর দুই ওভারে দুই উইকেট হারিয়ে আচমকাই চাপে পড়ে যায় পাঞ্জাব। ১২ ওভারে ফের ধাক্কা পাঞ্জাবের। শ্রেয়সের পর আউট জশ ইংলিশ। ক্রুণাল পাণ্ডিয়ার বলে বাউন্ডারিতে ক্যাচ ধরেন লিভিংস্টোন। ১৭তম ওভারে হ্যাজেলউড দিলেন ১৭ রান। পাঞ্জাবের রান ৪ উইকেট হারিয়ে ১৩৬। ১৬ ওভারে ফের উইকেট পতন পাঞ্জাবের। এবার ভুবনেশ্বরের বলে আউট হলেন নেহাল ওয়াধেরা (১৫)। দু’বল পরই ফের ধাক্কা পাঞ্জাবের। এবার আউট মার্কাস স্টয়নিস। আইপিএল ট্রফি ক্রমশ দূরে যাচ্ছে শ্রেয়সদের থেকে। পাঞ্জাবের রান ৬ উইকেট হারিয়ে ১৪২। এরপর শশাঙ্ক সিংহ একাই লড়লেন। ৩০ বলে ৬১ রান করলেন। কিন্তু পাশে কাউকে পেলেন না তিনি। শেষ পর্যন্ত ১৮৪ রানে শেষ হল পঞ্জাবের ইনিংস। ৬ রানে চ্যাম্পিয়ন হল বেঙ্গালুরু।
প্রসঙ্গত, আইপিএলের ইতিহাসে কোহলিই একমাত্র ক্রিকেটার, যিনি ১৮ বছর ধরে একটা দলেই খেলছেন। চেন্নাই টুর্নামেন্ট থেকে দু’বছর নির্বাসিত হওয়ায় মহেন্দ্র সিংহ ধোনিকে অন্য দলে খেলতে হয়েছে। রোহিত শর্মা দলবদল করেছেন। কিন্তু কোহলি বেঙ্গালুরু ছাড়েননি। পর্যাক্রমে, রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু তাঁর ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ হয়ে গিয়েছে। শুরুতে দলের তরুণ প্রতিভা ছিলেন। নিজেই বলেছেন, প্রথম বছরে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল তাঁর। ব্যাট করতে নেমে প্রথম রানটা করা পর্যন্ত অসম্ভব নার্ভাস ছিলেন। উল্টোদিকে ছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স। তাদের প্রধান বোলার ইশান্ত শর্মা। যিনি কোহলির দিল্লি টিমের সতীর্থ। বিরাটের প্রথম কাজ ছিল ইশান্তকে উইকেট না-দেওয়া। সেই কোহলি দ্রাবিড়-কুম্বলেদের ছায়া থেকে বেরিয়ে সিনিয়র হয়েছেন। শেষ কয়েক বছর তিনিই দলের ‘বড়দা’। অধিনায়ক না থেকেও পর্দার পিছনের নায়ক তিনিই। তাঁকে বাদ দিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত, কোনও পরিকল্পনা করে না বেঙ্গালুরু। রজত পাটীদারের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার আগেও কোহলির সবুজ-সঙ্কেত নেওয়া হয়েছিল। অনেকে বলেন, পাটীদার কোহলিরই ‘নির্বাচিত’। অধিনায়কত্বে তরুণ রক্ত আনতে চেয়েছিলেন বিরাটরাজ। এবার, সেই তরুণ তুর্কিরাই কোহলিকে চ্যাম্পিয়ন করতে মাঠে উজাড় করে দিয়েছেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*