রোজ দিন ডেস্ক:
নভেম্বর হলেও কলকাতায় কোনো শীতের আমেজ নেই তবে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাপ্রেমীদের ছবি দেখার উৎসাহ বা উদ্দিপনায় খামতি নেই এতটুকু। দুপুরে ছবি শুরুর অন্তত ঘণ্টা খানেক আগে থেকেই নন্দন এক-এর সামনে দর্শকেরা দীর্ঘ লাইনে জড়ো হন। ছবি দেখার ডেলিগেট কার্ড বা পাশ জোগাড় করার পরও দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাড়িয়ে অপেক্ষা- সে রোদ ঝলমলে দিনের বেলা হোক অথবা আলোকজ্জ্বল সন্ধ্যা ৭ থেকে ১৩ নভেম্বর সিনেপ্রেমীরা চলচ্চিত্রের ওমেই নিজেদের সেঁকে নেন৷ ভারতীয় বা বাংলা ভাষার ছবির প্রতি যেমন ঝোঁক তেমনি দেশ-বিদেশের নানা ভাষার ছবির প্রতি একই রকম আগ্রহ। আসলে এক ছাদের তলায় এত রকম ছবি দেখার সুযোগ কে আর হাত ছাড়া করতে চায়। এই জন্যই এতগুলি বছর ধরে প্রতিটি কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অপেক্ষায় থাকেন কলকাতাবাসী।
এবার কলকাতা সিনেমা উৎসবে ফোকাস কান্ট্রি পোল্যান্ড। সবমিলিয়ে ১৯টি পোলিশ ছবি দেখার সুযোগ রয়েছে উৎসবে। এর মধ্যে প্রয়াত পোলিশ চিত্রপরিচালক ওজসিচ জের্জি হাস -এর শতবর্ষ উপলক্ষে তিনটি ছবি রয়েছে, ‘THE HOURGLASS SANATORIUM’, ‘THE SARAGOSSA MANUSCRIPT’ এবং ‘THE’। ফোকাস কান্ট্রি পোল্যান্ড নিয়ে একটি প্রদর্শনীও চলছে গগনেন্দ্র প্রদর্শশালার দোতলায়। ৭নভেম্বর শুক্রবার নন্দন এক-এ দেখানো হয়েছে কন্টেম্পোরারি পোলিশ ছবি ‘চপিন, এ সোনাটা ইন প্যারিস’। স্বয়ং ছবির পরিচালক মিশাল কুইচিনস্কি হাজির ছিলেন প্রেক্ষাগৃহে। ছবি দেখে দর্শকের মন ভরে গিয়েছিল। ফোকাস কান্ট্রি পোল্যান্ড বিভাগে রয়েছে ওয়াজদার ‘অ্যাশেস অ্যান্ড ডায়মন্ডস’, হাসের ‘দ্য সারাগোসা ম্যানুস্ক্রিপ্ট’ ও দ্য আওয়ারগ্লাস স্যানাটোরিয়াম’, কিসলোস্কির ‘দ্য ডাবল লাইফ অব ভেরোনিক’, জানুসির ‘ইলুমিনেশন’, এমনকি পোলানস্কির প্রারম্ভিক প্রতীকী চলচ্চিত্র ‘নাইফ ইন দ্য ওয়াটার’।
এই ছবিগুলি বেছে নেওয়া হয়েছে এই জন্য যাতে কলকাতার দর্শক পোল্যান্ডের ইতিহাস, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের স্মৃতি, অস্তিত্ববাদী চিন্তা-ভাবনা ও রোমান্টিক প্রতিরোধের সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। পোল্যান্ডের সিনেমার অন্তরে লুকিয়ে থাকে এক ধরনের মানসিক দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে থাকে বিশ্বাস ও হতাশার দ্বন্দ্ব, কেবল তাই নয়, থাকে ধর্ম ও বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব, দেহ ও আত্মার দ্বন্দ্ব, মাটি ও স্বপ্নের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব দর্শকের কাছে খুবই আকর্ষণীয় বিষয়, কারণ আমাদের শিল্প ও জীবনের ইতিহাস এই দ্বন্দ্বেরই ফসল। কিশলোভস্কির ছবিতে যেমন প্রতিটি পছন্দের পেছনে থাকে নৈতিক সংকট, তেমনি ওয়াজদার ছবিতে আমরা দেখি যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে মানুষ তার নিজের মানবিকতা কিভাবে পুনরুদ্ধার করছে, আবার হাসের ছবিতে সময় ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আত্মার যাত্রা—সব মিলিয়ে পোলিশ চলচ্চিত্র যেন মানবমনের এক প্রতীকী মানচিত্র। সিনেমার পাশাপাশি থাকবে আলোচনা সভা, পরিচালকদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্ব বা আলাপ-আলোচনা। ‘সিনেমা অফ কনসায়েন্স’ নামে এক বিশেষ সেমিনার যেখানে পোল্যান্ড ও ভারতের সিনেমার সামাজিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
নন্দন এক-এ এদিন দুপুর দুটোয় দেখানো হয় মরক্কোর ছবি ‘আফ্রিকা ব্লাঙ্কা’, পরিচালক আজলারাবে আলাউই লামহারজি। সেনেগালের একটি অ্যালবিনো তরুণ এবং তার মাকে নিয়ে নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নিজেদের মাতৃভূমি থেকে পালিয়ে আসে। ইউরোপের দিকে তাদের যাত্রার প্রতি পদে পদে যেমন বিপদ, তেমনি নিষ্ঠুরতা। আফ্রিকার অ্যালবিনিজমের এক নিদারুণ মানবিক অবস্থাকে তুলে ধরেছে এই ছবিটি। সেই সঙ্গে মানব প্রকৃতি, মানব আত্মার গভীরতা এবং অন্ধকারের মুখে বেঁচে থাকার সংগ্রাম অন্বেষণ করে। এদিনই বিকেল সাড়ে চারটের সময় দেখানো হয় পোল্যান্ডের ছবি ‘ফ্রাঞ্জ’, পরিচালক অগ্নিয়েস্কা হল্যান্ড। ফ্রাঞ্জ কাফকার জীবন ও সাহিত্য ঘিরে এই ছবি তা বলে কোনো বায়োপিক নয়। বরং বলা যায় এক আত্মিক ডায়েরি, যেখানে সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে ভেসে ওঠে কাফকার অন্তর্নিহিত জীবনের অস্থিরতা ও বিষন্নতা। আমরা জানি কাফকা তাঁর জীবনের হয়তো অনেক মানুষের জীবনের বেদনাকে সাহিত্যে রূপ দিয়েছিলেন কিন্তু জীবিতকালে তিনি কোনো স্বীকৃতি পাননি। এই ছবিটি দেখা এক অর্থে নতুন করে কাফকার সাহিত্য পাঠ করা।

Be the first to comment