ফিবছর বন্যা উত্তরবঙ্গে যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী :

উত্তরবঙ্গ জুড়ে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে বহু এলাকা এখনও জলবন্দি, যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন। পাহাড় থেকে সমতলে নেমে আসা নদীগুলির তাণ্ডব চলছে। জল ঢুকছে নদীর আশেপাশের এলাকায়। বেহাল রাস্তাঘাট। জলবন্দি মানুষ দুর্গতির চরম সীমায়। অন্যদিকে তিস্তার রুদ্রমূর্তি দেখে আতঙ্কিত উত্তরবঙ্গবাসী, উদ্বেগে বাড়িঘর ছেড়ে  ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন অনেকেই। নদীর জলস্তর যে সীমায় তাতে উত্তরবঙ্গে বিপর্যয়ের শঙ্কা এখনও কাটেনি। পাশাপাশি পাহাড়ি অঞ্চল থেকে ধস নামার আশঙ্কা রয়ে গিয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে যে পরিস্থিতি এমন হবে তা তো কারও অজানা নয়। তাই উররবঙ্গবাসী বারে বারে সেই একই প্রশ্ন তোলেন, এবারও যার অন্যথা হয়নি- বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতে আগে থেকেই কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? এই পরিস্থিতিতে সোমবারই উত্তরবঙ্গে পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রী বন্যা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন। খবর তাঁর সফরের পরই উত্তরবঙ্গে পৌঁছাবেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অমিত শাহ। উল্লেখ্য, আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচন। গত বিধানসভায় উত্তরবঙ্গে বিজেপি শক্ত ঘাঁটি গড়েছিল কিন্তু লোকসভায় সেই জমি কিছুটা হারায়। এই অবস্থায় রাজ্য বিজেপি চায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অমিত শাহ উত্তরবঙ্গ সফর করে বন্যা কবলিত মানুষদের পাশে থাকার বার্তা দিন। ইতিমধ্যে জলপাইগুড়ির বন্যা দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে বিজেপির সাংসদ খগেন মুর্মু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, দার্জিলিং-এর সাংসদ রাজু বিস্ত প্রমুখ বন্যা পরিদর্শনে এসেছেন।

এতো গেল রাজনৈতিক প্রসঙ্গ আর উত্তরবঙ্গে বন্যা নিয়মিত ঘটনা। মানুষের সভ্যতার বিকাশে নদ-নদীর বিরাট ভূমিকা রয়েছে। প্রাচীন পৃথিবীর সভ্যতাগুলিতো নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। এখনও মানুষ কৃষিকাজ, মাছ শিকার, শক্তি উৎপাদন, পর্যটন থেকে শুরু করে ধর্ম, সংস্কৃতি ও আরও নানা কাজে নদ-নদীর জল ব্যবহার নদ-নদীর অস্তিত্ব সংকটাপন্ন, নদীতে মাছের বৈচিত্র কমছে, মৎস্যজীবীরাও দুশ্চিন্তায় আছেন, তার থেকেও বড় কথা অনেক নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বেশি বৃষ্টিতে নদীর জল উপচে বন্যা হচ্ছে। আমাদের রাজ্যের উত্তরবঙ্গের সবকটি জেলাতেই অসংখ্য ছোট-বড় নদী যেমন রয়েছে তেমনি আছে পাহাড়, ঝরনা, ঝোরা এবং অরণ্য। উত্তরবঙ্গের আটটি জেলা মিলিয়ে কমবেশি ২০০টিরও বেশি নদী। তার মধ্যে তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, মহানন্দা ছাড়াও আছে আত্রেয়ী, পুনর্ভবা, টাঙ্গন, কুলিক, সংকোষ, কলজানি, রায়ডাক। উত্তরবঙ্গের এই নদীগুলি বর্ষাকাল এলেই ফুলে ফেঁপে ওঠে। অতিরিক্ত জলস্ফীতির কারণে নদী পাড়ের এলাকায় প্রায়ই ধস নামে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন পলি জমে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় দু-এক বছর অন্তর অন্তর বন্যা প্রায় নিয়মে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। বন্যা কেবল ভয়াবহ নয়, বন্যায় সাধারণ মানুষ বিশেষ করে গরিব মানুষের জীবনে যে দুর্গতি নেমে আসে, তারা যে শোচনীয় পরিস্থিতিতে পড়েন তা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না।

কিন্তু বন্যার এই ভয়াবহতা থেকে কী আমরা কোনোভাবেই পরিত্রাণ পেতে পারি না? আর যাই হোক, বন্যা মোকাবেলায় সরকারি তরফে আগাম প্রস্তুতির পাশাপাশি সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা তো হয়েই থাকে, অন্তত সেরকমটাই তো আমরা জানি। নদীর পাড়ের ভাঙ্গন রুখতে বিশেষ প্রজাতির ঘাস লাগানো থেকে বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি কর্মসূচি ছাড়াও নদী খাত ড্রেজিং এবং নদী খাত পুনঃক্ষণন বা re excavation-এর কাজও তো প্রশাসনিক তরফে হয়ে থাকে। তবে কী বন্যা প্রতিরোধকারী বিভিন্ন নদীবাঁধগুলির অবস্থা ও স্লুইস গেটগুলি বর্ষা আসার আগে নিয়মিত নিরীক্ষণ করা হয় না? নদীর পাড় বাঁধ বা embankment ঠিক অবস্থায় রয়েছে কিনা সেই নজরদারিও ঠিকঠাক করা হয় না? অতিরিক্ত বৃষ্টি হওয়ার পরবর্তীতে যে অতিরিক্ত জমা জল, তাকে দ্রুত সরিয়ে দেবার জন্য যে নিকাশি ব্যবস্থা বা drainage system সেগুলি কতখানি কার্যকরী অবস্থায় রয়েছে, সেসব কি ঠিকঠিক ভাবে দেখে নেওয়া হয়না? Flood shelter বা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলি কি অবস্থায় রয়েছে, সেগুলি কী বর্ষা আসার আগে পরিদর্শন করা হয়? এই প্রশ্নগুলি উত্তরবঙ্গবাসী গত কয়েকটি বন্যার চূড়ান্ত অব্যবস্থার পর স্থানীয় প্রশাসনকে করেছিলেন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তরবঙ্গের যেসব নদীগুলিতে বাঁধ এবং স্লুইস গেট রয়েছে সেগুলি থেকে বর্ষাকালে জল ছাড়া হয়। প্রশ্ন, জল ছাড়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিস্থিতি বর্ষায় কি হতে পারে বা এলাকায় কি প্রভাব পড়তে পারে তার খবরাখবর কি প্রশসনের তরফে নেওয়া হয়? উত্তরবঙ্গে বন্যা প্রবণতা বৃদ্ধি পাবার অন্যতম একটি কারণ হল পরিবহন ব্যবস্থা। উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ নদী উত্তর থেকে দক্ষিন দিকে প্রবাহিত হয়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন সড়ক পথ, রেলপথ গিয়েছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। এই সড়ক পথ, রেলপথ নির্মাণের সময় থেকেই সংলগ্ন এলাকার নদীগুলির প্রবাহ অনেকটাই সংকীর্ণ হয়েছে। প্রসঙ্গত, জলপাইগুড়ি থেকে ময়নাগুড়ি যাওয়ার পথে তিস্তা ব্রিজের ২কিমি আগে ও ২কিমি পরে নদীটি যথেষ্টই স্ফীত ও চওড়া, কিন্তু তিস্তা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় নদীটি যথেষ্ট সংকীর্ণ। যার ফলে সেই অঞ্চলের তিস্তা নদীর পাড়ের ভাঙ্গন সেখানকার একটি বড় ধরনের সমস্যা। এছাড়া বলতে হয় তিস্তার বুকে একাধিক প্রকল্পের কথা যার প্রভাব ইতিমধ্যেই মারাত্মক আকার নিয়েছে।

এরপর রয়েছে তিস্তা ব্যারেজ, যার সঙ্গে যুক্ত আছে ফিডার ক্যানেল ও কৃষি ক্যানেল; সেখানে অনিয়মিত এবং ভারসাম্যহীন জলপ্রবাহ তিস্তায় বন্যার একটি অন্যতম কারণ। তাছাড়া উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ জায়গার নিকাশী ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট উন্নত নয়, ফলে বন্যা বিষয়টি কেবলমাত্র নদীর আঙ্গিক থেকে ভাবলেই হয় না। আরও একটি অত্যন্ত চিন্তার বিষয় হল আলিপুরদুয়ার জেলার নদীগুলি, বিশেষ করে জয়ন্তী নদীতে ভূটানের ব্যাপক হারে ডলোমাইট উত্তোলনের ফলে তার ধূলিকণা বা sediment ভূটান থেকে নেমে আসা স্রোত এসে মিশছে নদীগুলিতে। এতে নদীগুলির নাব্যতা ভীষণভাবেই কমেছে, যার ফলে আলিপুরদুয়ারের নদীগুলিতে প্রায়ই flash flood দেখা যায়। সেই সঙ্গে আছে নদীখাত থেকে অপরিকল্পিত ভাবে বালি-পাথর তুলে নেওয়া, এটা প্রকাশ্যেই চলছে, কোথাও কোথাও মেশিন বসিয়ে। এর ফলে বেশ কিছু অঞ্চলে নদী পথ বদলে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। বুঝতে অসুবিধা নেই যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বন্যা এবং তার সঙ্গে বন্যা সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা বিষয়টি নিয়ে গভীর কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নেই, তা নিয়ে কোনো চিন্তা ভাবনাও করা হয় না। তার ফলে বন্যা উত্তরবঙ্গের ক্যালেন্ডারে স্থায়ীভাবে জায়গা নিয়ে ফেলেছে, বাসিন্দারা কিছুতেই বন্যার আতঙ্ক থেকে দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারছেন না।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*