সপ্তমীর সকাল থেকে পথে নেমে পড়েছে গোটা কলকাতা। ভিড় আর জ্যামে হাঁসফাঁস পথঘাট। উৎসবের আবহে মাতোয়ারা শহরবাসী। আর এরই মধ্যে নিঃশব্দে প্রাণ ফিরে পেলেন অসুস্থ তিন রোগী। তা-ও আবার অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে।
চিকিৎসকেরাই বলছেন, এ যেন স্বয়ং মা দুগ্গার কৃপা! সকাল সকাল নবপত্রিকার স্নান সেরে ওই তিন জনকে আশীর্বাদ করলেন তিনিই। আর কাকতালীয় হলেও, যাঁর অঙ্গ নিয়ে তিন মৃতপ্রায় রোগী জীবনের আলো দেখলেন, তাঁর নামও দুর্গা। বাগুইআটির বাসিন্দা, ৬৮ বছরের দুর্গা সাধুর পরিবার অঙ্গদানের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার কারণেই এমনটা সম্ভব হল মঙ্গলবার।
সোমবার দুপুরে আচমকা সেরিব্রাল স্ট্রোক হয় দুর্গাদেবীর। তাঁকে বাইপাসের ধারে অ্যাপোলোতে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা চললেও অবস্থার কোনও উন্নতি তো হয়ই না, বরং তিনি কোমায় চলে যান। ভেন্টিলেশনে রাখা হয় তাঁকে। চিকিৎসকেরা সোমবার রাতেই জানিয়ে দেন, দুর্গাদেবীর ব্রেনডেথ হয়ে গিয়েছে। তিনি আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবেন না। স্বাস্থ্য দফতরে ঘটনাটি জানানো হলে সোমবার রাতেই অ্যাপোলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় দফতরের তরফে। দুর্গাদেবীর অঙ্গ তাঁর পরিবার দিতে রাজি কি না, জানতে চাওয়া হয়। অ্যাপোলো কর্তৃপক্ষ দুর্গা সাধুর পরিবারের কাছে অঙ্গদানের প্রস্তাব রাখলে, মেনে নেন তাঁরা। জানানো হয়, এসএশকেএমের তিন রোগীর দেহে দুর্গার দু’টি কিডনি এবং একটি লিভার প্রতিস্থাপন করা হবে।
এর পরেই শুরু হয় যুদ্ধকালীন তৎপরতা। এসএসকেএমের চিকিৎসকেরা রাতেই পৌঁছে যান অ্যাপোলোয়। ষষ্ঠীর রাতে যখন সারা শহর মেতেছে উৎসবে, তখন হাসপাতালের ভিতরে সারা রাত ধরে চলে দুর্গাদেবীর দেহ থেকে অঙ্গ সংগ্রহের প্রক্রিয়া। এর পরে মঙ্গলবার সকাল ৮টা ২০ নাগাদ অঙ্গগুলি নিয়ে অ্যাপোলো থেকে এসএসকেএমের উদ্দেশ্যে রওনা দেন চিকিৎসকেরা।
ট্র্যাফিক পুলিশের দক্ষতা এবং তৎপরতায় পুজোর সময়েও তৈরি হয় গ্রিন করিডর। তার মাধ্যমে মাত্র ২০ মিনিটে এসএসকেএমে পৌঁছান চিকিৎসকেরা। ফের শুরু হয় অস্ত্রোপচার। দিনভর টানটান উত্তেজনা ওটি-র বাইরে। মৃত দুর্গাদেবীর দু’টি কিডনি প্রতিস্থাপিত হয় খড়দহের ৫২ বছরের রামকৃষ্ণ দাস এবং মেদিনীপুরের ৫০ বছরের কাজি আবদুল আলিমের দেহে। অন্য দিকে লিভারও দেওয়া হয় অন্য এক জনকে। সব ক’টি প্রতিস্থাপনই আপাতত সফল হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
হাসপাতাল সূত্রের খবর, দুর্গাদেবীর চোখও দিয়ে দেওয়া হবে শঙ্কর নেত্রালয়ে। এবং তাঁর ত্বক রেখে দেওয়া হবে এসএসকেএমের-ই স্কিন ব্যাঙ্কে। তবে হৃদযন্ত্রের অবস্থা ভাল না থাকায় কাজে লাগানো যায়নি সেটা।
দুর্গা সাধুর ছেলে দেবাশিস সাধু বলেন, “মা তেমন অসুস্থ ছিলেন না। ৮-১০ বছর আগে এক বার স্ট্রোক হয়েছিল। রবিবার রাতে আমরা একসঙ্গে খেয়েছি। মা টিভিও দেখেছেন। কিন্তু তাঁর অসুস্থতার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি।” তিনি আরও জানান, সোমবার ভোরবেলা দু’বার বমি করেন দুর্গাদেবী। মাথা যন্ত্রণা করছে বলে জানান। তখনই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সিটি স্ক্যানের রিপোর্টে দেখা যায় তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। অঙ্গদানের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে দেবাশিস বলেন, “মায়ের শরীর তো জ্বলে যাবে। কিন্তু, অঙ্গ যদি কারও কাজে লাগে, তাঁদের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন মা।”

Be the first to comment