নেতাজির (Netaji) উদ্যোগেই কলকাতায় প্রথম পাঁচচালার দুর্গা ও থিমের পুজো

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী :

১৯৩৮ সালের কথা। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (Netaji) সে বছর কুমোরটুলি সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির প্রেসিডেন্ট। পঞ্চমীর দিন একচালার দুর্গা প্রতিমা সমেত মণ্ডপ প্রস্তুত। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় হঠাৎ আগুন লেগে পুড়ে ছাই হয়ে গেল প্রতিমা এবং মণ্ডপ। পরের দিন ষষ্ঠীতে বোধন। কমিটির সবার মাথায় হাত। বিপদ বুঝে পঞ্চমীর রাতেই নেতাজি ছুটে এলেন কুমোরটুলির মৃৎশিল্পী গোপেশ্বর পালের কাছে।

নেতাজি শিল্পীকে বললেন, যে ভাবেই হোক এক রাতের মধ্যেই প্রতিমা তৈরি করতে হবে। শুনে শিল্পী মাথায় হাত রাখলেন, কীভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়? আলোচনা শুরু হল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও শিল্পী গোপেশ্বর পালের। দু-জনের আলোচনা থেকে উঠে এল এক আপৎকালীন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। একজন নয়, একাধিক শিল্পী মিলে রাত জেগে, অক্লান্ত পরিশ্রম করে গড়বে এক নতুন আঙ্গিকের দুর্গা প্রতিমা। প্রচলিত একচালার প্রতিমা ভেঙে তৈরি হবে পাঁচ চালার প্রতিমা। নেতাজি সুভাষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই মৃৎশিল্পী গোপেশ্বর পাল গড়লেন সেই দুর্গা প্রতিমা।

একটি দুর্ঘটনা থেকে সেই বছর বঙ্গজীবনে অসুর, সিংহ সহ আলাদা দুর্গা এবং আলাদা লক্ষী, গণেশ কার্তিক ও সরস্বতীর আবির্ভাব ঘটলো। পঞ্চমীর সন্ধ্যায় কুমোরটুলি সার্বজনীন পুজো মণ্ডপে ওই দুর্ঘটনা থেকেই জন্ম দিল পাঁচচালার দুর্গা। সেইসঙ্গে তৈরি হল প্রতিমার জমকালো সাজ। কিন্তু বেঁকে বসলো পুরোহিত সমাজ। তাঁরা জানালেন, কেউ এই প্রতিমার পুজো করবেন না। বহু তর্ক, আলোচনার পর অবশেষে পুরোহিতেরও সন্ধান মিললো এবং যথারীতি পুজোও সম্পন্ন হল। পরের বছর (১৯৩৯) নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (Netaji Subhas Chanda Bose) সেবারও সভাপতি, কুমোরটুলি সার্বজনীন দুর্গা প্রতিমার গায়ে বাঘ ছাল চাপিয়ে দিলেন প্রতিমা শিল্পী গোপেশ্বর পাল। বলা যায় সেই প্রথম প্রতিমা শিল্পী গোপেশ্বর পাল দুর্গাপুজোয় “থিম”-এর জন্ম দেন। আর তাই দেখতে কুমোরটুলি মণ্ডপে উপচে পড়েছিল মানুষের স্রোত।

প্রসঙ্গত, বারোয়ারি বা বারো জন ইয়ার বা বন্ধুর চাঁদায় দুর্গাপুজো হয় হুগলির গুপ্তিপাড়ায় ১৭৯০ সালে। একে একে কলকাতার ভবানীপুরের সনাতন ধর্মোৎসাহী সভা বলরাম বসু ঘাট রোডে বারোয়ারি দুর্গাপুজোর আয়োজন করে। তাপর ১৯১০ সালে উত্তর কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিটে বৃন্দাবন মাতৃমন্দিরের বারোয়ারি দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতায় সার্বজনীন দুর্গাপুজো শুরু হয় ১৯২৬ সালে। সার্বজনীন মানে সব স্তরের জনসাধারণের চাঁদায় পুজো।

প্রথম সার্বজনীন পুজো ছিল দুটি, সিমলা ব্যায়াম সমিতি ও বাগবাজার সার্বজনীন। ১৯১৯ সালে শুরু হওয়া বাগবাজারের পুজোটি ছিল বারোয়ারি। কথিত আগের বছর (১৯১৮) তে স্থানীয় কিছু যুবক বড়োলোক বাড়িতে দুর্গাপুজো দেখতে গিয়ে অপমানিত হন। পরের বছর (১৯১৯)-এ তাঁরা বারোয়ারি পুজো শুরু করে পুজো মণ্ডপ সবার জন্য খুলে দেন। তখন সে পুজোর নাম ছিল নেবু বাগান বারোয়ারি। ১৯২৬-এ নাম পাল্টে হয় বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব। ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে এই পুজো কমিটির সভাপতি ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। বাগবাজার ছাড়াও নেতাজি কুমারটুলি সার্বজনীন পুজোর সভাপতি হয়েছিলেন, পরবর্তীতে সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজোরও সভাপতি হন। বাগবাজারের একচালার প্রতিমা গড়তেন জিতেন পাল। তাঁর সময় থেকেই প্রতিমার সাজ আলাদা করে অর্ডার দিয়ে তৈরি করানো হত। সেই সাজ ও অলংকার তৈরি করে দিতেন নদীয়ার কৃষ্ণনগরের রথীন সাহা। ডাকযোগে সেসব সাজ আসতো বলে এই সাজের নাম ছিল ডাকের সাজ। বিখ্যাত শিল্পী গোপেশ্বর পাল কুমারোটুলিতে প্রথম স্টুডিও তৈরি করেন। পরবর্তীতে পূর্ব বঙ্গের ফরিদপুর থেকে মূর্তি গড়ার কাজ শিখতে এপার বাংলার কলকাতায় এলেন রমেশচন্দ্র পাল। তারপর শোভাবাজার ঘাটের কাছে, কুমোরটুলি এলাকায় প্রতিমা শিল্পের হাব তৈরি হয়।

এর অনেক আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে বাংলায় এক শ্রেণির নব্য জমিদারদের আবির্ভাব ঘটে। সেই নব্য জমিদারেরা প্রথমে কলকাতায় নিজেদের বাড়িতে দুর্গা পুজো শুরু করেন। এরপর বাড়ির দুর্গাপুজো কলকাতা পেরিয়ে বাংলার গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজোয় সাহেবদের জন্য থাকতো বিলাস-ব্যসনের এলাহি ব্যবস্থা। খাওয়া দাওয়া ছাড়াও চলতো বাইজীদের নাচ, পানীয়ের আসর— সবকিছুর মূল আসলে ইংরেজ অভ্যার্থদের সন্তুষ্ট রাখা।

১৭৬৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক কর্মকর্তা জে জেড হোলওয়েল দুর্গা পুজো নিয়ে তাঁর এক লেখায় জানান, “পূজায় সাধারণত কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সকল ইউরোপীয়দের আমন্ত্রণ জানানো হত। অভ্যাগতদেরকে ফুল দিয়ে সমাদর জানানো হত। তাদের জন্য ফলসহ বিপুল খাবার-দাবারের ব্যবস্থা থাকতো। প্রতি সন্ধ্যায় আগত অতিথিদের বিনোদনের জন্য বাইজী নাচ ও গানের জলসার আয়োজন করা হত।” কিন্তু জমিদার বাড়ির পুজোয় সমাজের সব শ্রেণির মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। কেবলমাত্র গণ্যমান্যরাই নিমন্ত্রণ পেতেন। বাকিদের শরিক হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। তবে ব্যতিক্রমও ছিল। জানবাজারের রানী রাসমণির বাড়ির দুর্গা পুজোতে ইংরেজ অতিথিদের বিনোদনের পরিবর্তে প্রজাদের বিনোদনের জন্য যাত্রাপালা এবং কবিয়াল গানের আসর বসতো। এই পুজোয় রানীর প্রজারা অংশগ্রহণ করতেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*