নিজস্ব প্রতিনিধি, শান্তিপুর:
বিদেশে এর ব্যবহার বহু আগেই দেখা গেছে। কিন্তু ভারতে প্রথম পরিবেশবান্ধব রাস্তার পরীক্ষামূলক নির্মাণ শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের মে মাসে, বাংলার পূর্ব বর্ধমান জেলার রায়না ২ নম্বর ব্লকে। রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রীর উদ্যোগে ২২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তৈরি হয়েছিল মাত্র ৩২০ মিটার রাস্তা। সেখান থেকেই পথ দেখিয়েছে গোটা রাজ্য। আর এবার সেই নব উদ্যোগের পথেই পা রাখল নদীয়ার শান্তিপুর ব্লকের গয়েশপুর পঞ্চায়েতের মানিকনগর গ্রাম।
এখানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনগ্রসর শ্রেণী কল্যাণ দপ্তরের আর্থিক সহায়তায় এবং শান্তিপুরের বিধায়ক ব্রজকিশোর গোস্বামীর তৎপরতায় শুরু হয়েছে তিনটি পরিবেশবান্ধব রাস্তার নির্মাণকার্য। মোট ব্যয় বরাদ্দ ৩৮ লক্ষ টাকা। প্রকল্পটির তত্ত্বাবধান করছেন জেলার প্রধান ইঞ্জিনিয়ার।
রাস্তার কাজ শুরু হওয়ার দিন মানিকনগরে যেন উৎসবের আবহ। উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক ব্রজকিশোর গোস্বামী, স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্যরা এবং বিপুলসংখ্যক গ্রামবাসী। আদিবাসী নৃত্যের সঙ্গে ছিল ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তা। গ্রামজীবনের এই আনন্দঘন মুহূর্ত যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এক নতুন সূচনা।
বিধায়ক জানান, “আজকের অনুষ্ঠান শেষে জেলা প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিতে হচ্ছে। তবে আগামীকাল আবার আসব।” রাস্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়ন ভাবনা এবং রাজ্যের নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় রেখে শান্তিপুরে যে পরিবর্তনের ধারা শুরু হয়েছে, এই কাজ তারই অঙ্গ।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বিধায়ক হওয়ার অনেক আগে থেকেই শান্তিপুরের সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে আমার পরিকল্পনা ছিল। এখন সেটাই বাস্তবায়িত হচ্ছে—এক ধাপে এক ধাপে।”
মানিকনগর এমন এক গ্রাম যেখানে পৌঁছাতে হলে ভাগীরথী নদী পার হতে হয়। বহু বছর ধরেই এখানকার মানুষ অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন—জনপ্রতিনিধিদের নজর পড়ে না তাঁদের ওপর। তাই বিধায়ক পদে আসীন হওয়ার পর থেকেই ব্রজকিশোর গোস্বামী সিদ্ধান্ত নেন, উন্নয়নের সূচনা করবেন সেখান থেকেই।
গত কয়েক বছরে মানিকনগরে তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সংস্কার হয়েছে স্টেডিয়াম, বরাদ্দ হয়েছে রাস্তা উন্নয়ন তহবিল, এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সহায়তায় পরিষেবা ব্যবস্থায় এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। নতুন রাস্তা নির্মাণ সেই ধারারই পরবর্তী অধ্যায়।
এই রাস্তার বিশেষত্ব এর নির্মাণ পদ্ধতিতে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ১০০০ কেজি বর্জ্য প্লাস্টিক পরিশোধন করে তৈরি হয় ৫৫০ কেজি প্লাস্টিক দানা, যা ব্যবহৃত হচ্ছে রাস্তার মিশ্রণে। এতে শুধু টেকসই রাস্তা তৈরি হচ্ছে না, একসঙ্গে কমছে প্লাস্টিক দূষণও।
প্রধান ইঞ্জিনিয়ার জানিয়েছেন, “এই প্রযুক্তি ব্যবহারে রাস্তার স্থায়িত্ব বাড়বে অন্তত ৩০ শতাংশ, পাশাপাশি পরিবেশ দূষণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। ভবিষ্যতে রাজ্যের অন্যান্য ব্লকেও এই মডেল প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।”
এলাকাবাসীর মুখে এখন স্বস্তির হাসি। তাঁদের কথায়, “এতদিন ধরে আমরা অবহেলিত ছিলাম। আজ গ্রামে রাস্তা হচ্ছে, সেটাও আবার পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে—এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।”
একদিকে দূষণ রোধ, অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার—দুই দিকেই সাফল্যের ছাপ ফেলেছে এই উদ্যোগ। মানিকনগরের রাস্তা এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এক নতুন দৃষ্টান্ত—যেখানে উন্নয়ন ও পরিবেশ একসঙ্গে হাত ধরেছে।

Be the first to comment