রোজদিন ডেস্ক, কলকাতা:- আবারও রাজ্যে শিল্পায়নের বার্তা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের। নিউটাউনের ২৫ একর জমির উপর তৈরি হতে চলেছে আন্তর্জাতিক মানের তথ্যপ্রযুক্তি ও বিনোদন পার্ক। পিপিপি মডেলের এই নতুন আইআইটেক পার্কের নাম দেওয়া হয়েছে বিশ্ব অঙ্গন। পাশাপাশি, পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরের ১০টি জমি শিল্পের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান মমতা। এছাড়াও, পুরুলিয়া, দুর্গাপুর, পানাগড়ে একাধিক সংস্থাকে শিল্পের জন্য জমি দেওয়া হবে সরকারের পক্ষ থেকে।
ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের আয়োজন করে রাজ্য সরকার। তার ফলে বিনিয়োগ আসছে। বাড়ছে রাজ্যের আয়। বিদেশ থেকেও লগ্নি এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে তা সত্ত্বেও প্রায়শয়ই রাজ্যে শিল্প, কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিরোধীরা। তবে বুধবার পুরুলিয়া, পানাগড়, দুর্গাপুর, হাওড়া-সহ একাধিক জায়গায় বিভিন্ন জমি চিহ্নিত করে শিল্পায়নের বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নবান্নে এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “রাজ্যে দ্রুত শিল্পায়ন আমাদের লক্ষ্য। পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে ১০টি জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। পুরুলিয়া, পানাগড়, দুর্গাপুরে একাধিক সংস্থাকে জমি দেওয়া হয়েছে। কর্মক্ষেত্র তৈরি সরকারের লক্ষ্য। কয়েকশো কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে একাধিক সংস্থাকে জমি দেওয়া হয়েছে। বাংলায় শিল্পের জন্য আরও অনেকে জমি চাইছেন।”
একই সঙ্গে রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় আড়াই হাজার একর জমিতে ২৫ হাজার কোটির বেশি বিনিয়োগ করতে চলেছে ১০টি শিল্প সংস্থা। এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৭০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। বুধবার নবান্নের সাংবাদিক বৈঠক থেকে একথা জানান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দ্রুত শিল্পায়নের লক্ষ্য আমাদের রয়েছে। বিজিবিএস এর পর বেশ কিছু শিল্প সংস্থার জন্য জমি আমরা ছেড়ে দিয়েছি। আজকে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে জঙ্গল সুন্দরী কর্ম নগরী, দুর্গাপুর, বর্ধমানের পানাগর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে দশটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্লট বিভিন্ন কোম্পানিকে বরাদ্দ করা হয়েছে। মোট জমির পরিমাণ ২,৫১৫ একর। মোট বিনিয়োগ ২৫ হাজার কোটির বেশি। সরাসরি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান হবে ৭০ হাজারের বেশি মানুষের। এগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই স্টিল ইন্ডাস্ট্রি বা ইস্পাত শিল্প। এছাড়াও বাংলায় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করার জন্য পনেরোটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটে কয়েকশো কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে আমাদের রাজ্যে ৯০ লক্ষ ইউনিটে প্রায় এক কোটির বেশি মানুষ কাজ করে। আগামী দিনে এই সেক্টরে আরও উন্নতি হবে।
শিল্পায়নের ফলে রাজ্যে ক্রমশ বাড়ছে কর্মসংস্থান। ইস্পাত শিল্পে কর্মসংস্থান আরও বাড়বে বলেই আশা মুখ্যমন্ত্রীর। মমতা এদিন আরও জানান, রাজ্যের প্রায় প্রত্যেক জেলায় একটি করে বড় শপিং মল বা বিগ মার্কেট খোলা হবে। যেখানে হস্তশিল্পীরা নিজের হাতে তৈরি জিনিসপত্র সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন। তার ফলে বাড়বে আয়।
পাশাপাশি, ইকো পার্ক, মাদার ওয়াক্স মিউজিয়াম, বিশ্ববাংলা গেটের পর নিউটাউনের মুকুটে নতুন পালক! এবার সেখানে তৈরি হবে বিশ্ব অঙ্গন। যেখানে বিশ্বমানের কনসার্ট আয়োজন করা যাবে। বুধবার এমনই ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিউটাউনে তৈরি হচ্ছে নতুন আইটি, বিনোদন, সাংস্কৃতিক পার্ক। নাম দেওয়া হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড এন্টারটেনমেন্ট কালচারাল পার্ক, সংক্ষেপে আইআইটেক। বাংলায় বিশ্ব অঙ্গন। হিডকোর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে পিপিপি মডেলে ২৫ একর জমিতে এই পার্ক তৈরি করবে রাজ্য। জমি বাছাই করা হয়ে গিয়েছে। আজ মন্ত্রিসভা এই প্রকল্পের প্রস্তাবে ছাড়পত্র দিয়েছে। এরপর টেন্ডার করে কাজ শুরু হবে। এই জমিতে তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা থেকে বিনোদন দুনিয়ার সকলে বিশ্বমানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারবে। আয়োজন করা যাবে বিশ্বমানের কনসার্টের।
এদিন নবান্নে সাংবাদিক সম্মেলন থেকে রাজ্য সৌন্দর্যায়নের খতিয়ান দেন মুখ্যমন্ত্রী। কীভাবে দক্ষিণেশ্বর থেকে কালীঘাট, গঙ্গারঘাট থেকে গঙ্গাসাগর সাজিয়ে তোলা হয়েছে তা তিনি তুলে ধরেন। তারপরই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বিশ্ব অঙ্গন ভবিষ্যতে গর্বের বিষয় হবে রাজ্যের। হিডকোর সঙ্গে পিপিপি মডেলে নিউটাউনে ২৫ একর জমিতে একটি ইন্টারন্যাশনাল ইনফরমেশন টেকনোলজি, এন্টারটেনমেন্ট অ্যান্ড কালচারাল পার্ক তৈরি করতে চলেছি। কারণ, মনে রাখবেন, যারা ওয়ার্ল্ড ট্যুরে আসেন, তথ্যপ্রযুক্তি, বিনোদন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেন তাঁদের সুবিধা হবে। মনে রাখবেন, কনসার্ট ইকোনমি এখন নতুন ভাবনা। সমস্ত এক্সজিবিশন, এন্টারটেনমেন্টের জন্য বিরাট ব্যবস্থা করা হবে। ২৫ একর জায়গা মানে বিরাট বড় এলাকা।” তাঁর কথায়, এই পার্কে তথ্য প্রযুক্তি থেকে বিনোদন কিংবা সৃজনশীল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যাবে। এমনকী, বিশ্বমানের কনসার্টও করা যাবে এখানে।
এমনকি, এদিন নবান্নের বৈঠকে ২৩টি জেলার মধ্যে ১১ টা জেলায় মল তৈরির জন্য জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। এগুলি হল- পুরুলিয়া, দার্জিলিং, বাঁকুড়া, কোচবিহার, হাওড়া, জলপাইগুড়ি, ঝাড়গ্রাম, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিম মেদিনীপুর ও উত্তর দিনাজপুর জেলায়। মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজারহাট ও দিঘায় যেমন কনভেনশন সেন্টার রয়েছে তেমন একটি কনভেনশন সেন্টার এবার তৈরি করা হবে শিলিগুড়িতেও।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, আমরা জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষা করব এবং শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করব।” এই প্রকল্পে স্থানীয় কৃষক এবং জমির মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হবে।
এই উদ্যোগ পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাজ্যের তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদন, এবং পর্যটন শিল্প ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। নতুন শিল্প ইউনিট এবং বিশ্ব অঙ্গনের মতো উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলি এই প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করবে। এছাড়া, গ্রুপ সি এবং গ্রুপ ডি পদে নিয়োগের মাধ্যমে রাজ্যের বেকারত্বের হার কমবে এবং যুবকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের এই দ্রুত শিল্পায়নের লক্ষ্য ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের শিল্প মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে সহায়তা করবে। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা রাজ্যের জনগণের মধ্যে নতুন আশা ও উৎসাহ সঞ্চার করেছে। আগামী দিনে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কীভাবে এগিয়ে যায়, তা দেখার জন্য সকলেই অপেক্ষায় রয়েছে।

Be the first to comment